সশ্রদ্ধচিত্তে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছে জাতি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয় যখন দ্বারপ্রান্তে ওই সময়ই জাতিকে মেধাশূন্য করতে দোসরদের সহায়তায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল পাক-হানাদার বাহিনী। পরিকল্পিত ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্থানীয় সহচর ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত আল-বদর, আল-শামস বাহিনী।

বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ। এই দিন বেছে বেছে হত্যা করা হয় শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের। ঘাতকদের লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যেন মাথা উঁচু করে না দাঁড়াতে পারে।

সশ্রদ্ধচিত্তে আজ সোমবার জাতি সেইসব সূর্যসন্তানদের স্মরণ করছে। আজ সকাল থেকেই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্যে জাতির শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেছেন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা সকাল ৭টা ২২ মিনিটে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। আর সকাল সাড়ে ৮টায় তারা রায়েরবাজারের বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এরপর সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে থেকে সর্বস্তরের জনগণ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এতে অংশ নেন নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনায় ও দখলদার হানাদার বাহিনীর মদদে এই হত্যাকাণ্ডটির বাস্তবায়ন ঘটায় স্থানীয় দালাল আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা। আর বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার এই নীলনকশার মূল মাস্টারমাইন্ড পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে চালানো হয় এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

বিজয় অর্জনের পরে রায়েরবাজারের পরিত্যক্ত ইটখোলা, মিরপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে একে একে পাওয়া যায় হাত-পা-চোখ বাঁধা দেশের খ্যাতিমান এই বুদ্ধিজীবীদের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। তাদের নিথর দেহজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারও কারও শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। হত্যার আগে তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর আলামত মেলে মৃতদেহে। এতে উন্মোচিত হয় ঘাতকদের বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা। এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে বিশ্ববিবেক।

এদিন ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এ এন এম মুনীর চৌধুরী, ড. জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান, ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মো. সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ।

সাংবাদিকদের সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীনকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকেরা।

এছাড়া শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, সাহিত্যিক পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মেহেরুন্নেসা, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাসহ আরো অনেকেই এদিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।