গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : প্রগতিশীল কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের ৩৩তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৯৮৮ সালের ২৪ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
উদার দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর মানবিকতাবোধ ও সমাজপ্রগতির ভাবনা তাঁর চরিত্রের বিশেষ দিক।
এ ছাড়াও তিনি একজন সফল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ছিলেন। দুটো মাধ্যমেই সরব ছিলেন তিনি।
অবশ্য তিনি রাজনীতিকও ছিলেন। ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছিলেন তিনি। লেখক হিসাবে ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল। উপন্যাস, ছোট গল্প ও মননশীল প্রবন্ধ লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত পদ্মা মেঘনা যমুনা উভয় বাংলার সাহিত্যের একটি অনন্য গ্রন্থ। এ ছাড়াও তাঁর রচিত বেশ কিছু গ্রন্থ ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, জাপানি ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করা হয়েছে।
আবু জাফর শামসুদ্দীন ১৯১১ সালের ১২ মার্চ কালীগঞ্জের দক্ষিণবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের প্রভাত পন্ডিতের পাঠশালায়। ১৯২৪ সালে স্থানীয় একডালা মাদ্রাসা থেকে জুনিয়র মাদ্রাসা পরীক্ষায় ও ১৯২৯ সালে ঢাকা সরকারি মাদ্রাসা থেকে হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় পাস করেন। কিছুদিন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সাংবাদিকতায় যোগ দেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দৈনিক সুলতানের সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩১ সালে তিনি সরকারের সেচ বিভাগে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে সেচ বিভাগের কাজ পরিত্যাগ করে কটকে নির্মাণাধীন বিমানঘাঁটি তদারকি অফিসের হেড ক্লার্ক পদে যোগ দেন। কয়েক মাস পর তিনি এ চাকরি ছেড়ে আবার সাংবাদিকতা শুরু করেন। এ সময় তিনি দৈনিক আজাদে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে পত্রিকাটি কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসার পর তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫০ সালে আজাদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হলে তিনি প্রকাশনা ব্যবসা সংস্থা কিতাবিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫০-৫১ সালে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন বহুদর্শী-বিরল ব্যক্তিত্ব। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত কাগমারীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্মলগ্ন থেকেই তিনি এই দলটির সঙ্গে জড়িত হন এবং কিছুদিন ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমির অনুবাদ বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে পূর্বদেশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। সংবাদে তিনি অল্পদর্শী ছদ্মনামে বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা নামে কলাম লেখেন।
পরিত্যক্তস্বামী, মুক্তি, ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান, পদ্মা মেঘনা যমুনা, সংকর সংকীর্তন, প্রপঞ্চ, দেয়াল তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। গল্প গ্রন্থ : জীবন, শেষ রাতের তারা, রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা, ল্যাংড়ি, নির্বাচিত গল্প। প্রবন্ধ গ্রন্থ: চিন্তার বিবর্তন ও পূর্বপাকিস্তানী সাহিত্য, সোচ্চার উচ্চারণ, সমাজ সংস্কৃতি ও ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্য, ইসলাম ও সমকালীন রাজনীতি, লোকায়ত সমাজ ওবাঙালি সংস্কৃতি, বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা ইত্যাদি।
কর্মজীবনে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৮৩), সমকাল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), শহীদ নূতনচন্দ্র সিংহ স্মৃতিপদক (১৯৮৬), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬) ও ফিলিপস পুরস্কার (১৯৮৮) (মরণোত্তর)।