গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কর্মী আইন সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পেশাদার সাংবাদিকরা এর বিরোধিতা করছেন। এই আইন নিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) তাদের অবস্থান জানাতে শুক্রবার রাতে জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
২৮ মার্চ প্রস্তাবিত আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। টিআইবি এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে আইনটির বেশ কিছু ধারার সমালোচনা করেছে। তবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শুক্রবার ঢাকায় তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে টিআইবির সমালোচনা করে বলেছেন, ‘‘কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে কথা বলা টিআইবির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই প্রস্তাবিত আইন আইন দুর্নীতির কোনো বিষয় নয়।’’
তবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, ‘‘আমরা আইনটি পর্যালোচনা করে দেখবো। অংশীজনের সঙ্গে কথা বলবো। তারপর আমরা আমাদের মতামত দেবো।’’
বিএফইউজের সভাপতি মো. ওমর ফারুক দাবি করেন, প্রস্তাবিত আইনটির ৫৪টি ধারার মধ্যে ৩৭টি ধারাই সাংবাদিকবান্ধব নয়। এই আইনটি মালিকদের সুবিধার জন্য করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আইনটি পাস হলে সাংবাদিকরা রুটি-রুজি এবং অধিকার আদায়ের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবেনা। তারা শ্রম আইনের সুবিধা পাবেন না।’’
তিনি বলেন, ‘‘এই আইনে সাংবাদিকদের চাকরিজীবন শেষে সার্ভিস বেনিফিট অর্ধেক করে দেয়া হয়েছে। আগে গ্র্যাচুইটির বিধান ছিল প্রতিবছর দুইটি, এখন একটি করা হয়েছে। আগে বিনোদন ছুটি তিন বছরে ৩০ দিন ছিল, সেটা কেটে ১৫ দিন করা হয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। কল্যাণ সমিতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো সাংবাদিক যদি অন্য হাউজের সহকর্মীর বিপদে ছুটে যেতে চান, তাকে ছুটি নিয়ে যেতে হবে, অন্যথায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’’
তিনি বলেন, এই আইনে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের জন্য কিছু বলা হয়নি। ‘সম্পাদক’ শব্দটি নেই। এটা একটা অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ আইন।
এই আইনে সাংবাদিকদের মাসের বেতন প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু না দিলে কী হবে তা বলা হয়নি। তবে নিম্নতম হারের চেয়ে কম বেতন দিলে এক বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। শ্রম আদালত নয়, সাংবাদিকদের জন্য নতুন ‘গণমাধ্যম আদালতের’ কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিক ছাঁটাই, বরখাস্তের বিধানে সরকারকে অবহিত করার বিষয় রয়েছে। আর অসদাচরণের জন্য বরখাস্তের কথা বলা হলেও অসদাচরণের কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ওয়েজবোর্ড সরকার গঠন করবে বলা হলেও তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘এই আইনটি হলো সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এই আইনে কিছু ভালো দিক থাকলেও সেই অধিকার ও সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বলা হয়েছে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। এটা কিসের ভিত্তিতে বলা হলো? খাবার ও বিশ্রামের সময় কোথায়? পৃথিবীর কোনো দেশেই সপ্তাহে ৩৫-৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার বিধান নেই। সপ্তাহে একদিন ছুটির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দেশে দুইদিন ছুটি প্রচলিত। গণমাধ্যমকর্মীদের ৪৮ ঘণ্টার পরে ওভারটাইম করানো যাবে। কিন্তু সেটা সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা আর ওভারটাইমের ভাতার হিসাব কী হবে তা-ও বলা নেই। এই বিষয়গুলোকে আমরা বৈষম্যমূলক বলে মনে করি।’’
তার মতে, ‘‘সংবাদমাধ্যমের মালিক বা মালিকানা শব্দটি নেতিবাচক। ওয়েজ বোর্ড গঠন বাধ্যতামূলক না করায় সরকার যাতে ওয়েজবোর্ড গঠন না করতে পারে মালিকরা সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।’’
তিনি তাই মনে করেন, এই আইন পাস করার আগে অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে গণমাধ্যমকর্মীবন্ধব করা দরকার।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ টিআইবির বক্তব্যের সমালোচনা করে শুক্রবার বলেছেন, ‘‘টিআইবি আগ বাড়িয়ে বিবৃতি দিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে কোনো উদ্দেশ্য আছে। আইনটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আছে। সাংবাদিক নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে আইনটি পরিবর্ধন-পরিমার্জন করা হবে।’’
আর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘‘আমরা প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে বাইরে সমালোচনা শুনেছি। তবে অংশীজনরা এখনো আমাদের কিছু বলেননি। আমরা তাদের মতামত দিতে আহ্বান জানাবো। তারাও আমাদের কাছে আসতে পারেন। সবার কথা শুনে আইনটি নিয়ে আমরা মতামত দেবো। আমরা চাই এই আইনটি যেন গণমাধ্যমকর্মীবান্ধব হয়। এটা পুরো সংবাদমাধ্যমের জন্য কোনো আইন নয়। এটা সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মীদের জন্য আইন। সুতরাং তাদের কথাই আমাদের বিবেচনায় থাকবে।’’
তার কথা, ‘‘আমরা কমিটির সদস্যরা এই আইনটিকে প্রথমে পর্যালোচনা করবো। তারপর সবার সাথে কথা বলবো। আমাদের হাতে ৬০ দিন সময় আছে। প্রয়োজনে সময় বাড়িয়ে নিতে পারবো। মন্ত্রীর কিছু করার নেই। আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই।’’
সূত্র: ডয়চে ভেলে