নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলি করার কারণ অনুসন্ধান

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলি করার কারণ অনুসন্ধান

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জে বৃহস্পতিবার বিএনপির মিছিলে এমন কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে এমন কী হয়েছিল যে পুলিশকে গুলি করতে হলো? আর বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই বা কেন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন?

ঘটনায় যুবদলের একজন নিহত এবং শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে বিএনপি দাবি করেছে। আর পুলিশ বলছে তাদের কর্মকর্তাসহ ২০ জন আহত হয়েছেন ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাজা আহমেদ শাওন নিহত হওয়ার ঘটনায় তার ভাই মিলন সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।

সেখানে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে আর বলা হয়েছে, বিএনপির মিছিলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালে তিনি মিছিল অতিক্রম করার সময় ইট এবং আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন। পুলিশও তাদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের অ্যাডিশনাল এসপি আমির খসরু৷ পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে ডিআইটি এলাকার আলী আহমেদ চুনকা পৌর পাঠাগারের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে উত্তরে দুই নাম্বার রেলগেটের দিকে রওয়ানা হন। রেলগেটের কাছে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের বাধায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা ইট-পাটকেল ছোঁড়ে। পুলিশ লাঠিপেটা করার পাশাপাশি টিয়ার গ্যাস ও গুলিও ছোঁড়ে৷ গুলিতে যুবদল কর্মী শাওন নিহত হন।

ওই মিছিলে ছিলেন নারাণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি। তিনি নিজেও আহত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘‘ওই খানে পুলিশের গুলি ছোড়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। আমরা আগেই সমাবেশ করার জন্য জেলা প্রশাসক, মেয়র এবং সদর থানার ওসির কাছে লিখিত আদেন করি। কিন্তু তারা আমাদের হ্যাঁ বা না কিছুই বলেননি। আমরা বৃহস্পতিবার রেলগেটের কছাকাছি গেলে পুলিশের অ্যাডিশনাল এসপিসহ অন্য কর্মকর্তারা গিয়ে আমাদের রাস্তার এক পাশ ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু ওই রাস্তা দিয়ে কোনো যানবাহন চলে না। তারপরও আমরা এক পাশ খালি করে দিই। কিন্তু এরপরই তারা বলেন, আপনারা সমাবেশ করতে পারবেন না। এক পর্যায়ে পুলিশের বাধার মুখে আমাদের নেতা-কর্মীরা লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে চাষাড়ার দিকে যেতে চাই। সেখান থেকেই বাসে করে আমাদের নেতা-কর্মীরা যার যার এলাকায় চলে যাবেন। এর কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ করে আমাদের মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘পুলিশ গুলি করলো। আমার মুখে ছররা গুলি লাগলো। শওন ছেলেটা আমার সামনেই গুলিবিদ্ধ হয়। সে-ই আমাকে বলেছিল চাচা আপনি সরে যান, পুলিশ বন্দুক উঁচু করেছে, গুলি করবে। আমি সরে গেলাম, আমার কর্মীটা আমার সামনেই গুলিতে মারা গেল।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল ছোঁড়ে সত্য, তবে তা শাওন নিহত হওয়ার পর।’

গুলি ছোঁড়া কি জরুরি ছিল?

তবে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডিশনাল এসপি আমির খসরু বলেন, ‘‘মিছিল নিয়ে রেল গেটের কাছে যাওয়ার পর পুলিশ রাস্তা ছেড়ে দিতে বলে৷ ওই একটি রাস্তা দিয়েই নারায়ণগঞ্জের যানবাহন বাইরে চলাচল করে৷ তখন তারা রাস্তা না ছাড়লে ধাক্কাধাক্কি হয় পুলিশের সঙ্গে৷ এরমধ্যে তারা চার-পাঁচ হাজার লোক হয়ে যায়৷এরপর তারা ইট পাটকেল ছুঁড়লে পুলিশও লাঠিচার্জ করে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে৷ এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়৷ পুলিশ শট গান দিয়ে গুলি করে৷’’

গুলি করার মতো কোনো পরিস্থিতি ছিলনা- বিএনপির এই দাবির জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ১২-১৪ জন পুলিশ সদস্য রেলগেটের পাশে পুলিশ বক্সে আটকা পড়েন৷ বক্সটি চার দিক থেকে ফাইবার গ্লাস দেয়া৷চারপাশ ঘিরে যখন ইটপাটকেল ছোঁড়া হয় তখন একজন সাব ইন্সপেক্টরের মাথা ফেটে যায়৷ অবস্থা ছিল ব্যাঙ যখন পানিতে পড়ে, উপর থেকে ইট মারলে যা হয়, সেই অবস্থা৷ তখন পুলিশ সদস্যরা সারভাইব করার জন্য শট গানের গুলি করেছে৷ চার দিক থেকে ঘিরে যখন ইটপাটকেল ছুঁড়ছিল তখন তারা আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি করেছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘মামলার এজাহারে শাওনের ভাই অভিযোগ করেছেন আগ্নেয়াস্ত্র ও ইটের আঘাতে শাওন নিহত হয়েছে৷’’

সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না, পুলিশ তো শটগান দিয়ে গুলি করেছে৷’’

এদিকে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মিছিলে বাধা দেয়ার শুরুতে একজন অ্যাডিশনাল এসপির নেতৃত্বে ওই খানে ২০-২৫ জন পুলিশ ছিল৷ আর বিএনপির নেতা-কর্মী ছিল দেড় হাজারের মত৷ তখন বিএনপির নেতা-কর্মীদের সামনে টিকতে না পেরে ১০-১৫ জন পুলিশ গিয়ে পুলিশ বক্সে আশ্রয় নেয়৷ বাকিরা পিছু হটে যায়৷ এই খবর পেয়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে পাঠানো হলে সংঘর্ষ চরম আকার ধারন করে৷ এক ঘণ্টা ধরে এই সংঘর্ষ হয়৷ অতিরিক্ত পুলিশ আসার পর গুলিতে শাওন নিহত হন৷

বুকে গুলি লেগেছে

নিহত শাওনরা তিন ভাই এক বোন৷ শাওন ছিল ভাইদের মধ্যে ছোট৷ শাওনের ভাই ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘‘আমার ভাইয়ের বাম বুকে গুলি লেগেছে৷ আমরা হাসপাতালে গিয়ে তার মরদেহ পাই৷ আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই৷’’

তিনি বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার রাতেই পুলিশি নিরাপত্তায় আমার ভাইয়ের দাফন হয়েছে৷ পুলিশই হাসপাতাল থেকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে লাশ নিয়ে যায়৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আমরা ভাই কীভাবে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জানি না৷ তার ফেসবুকে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অনেক ছবি আছে৷ সে মেকানিকের কাজ করতো৷ বৃহস্পতিবার সকালে আমরা একই সঙ্গে কাজে বেরিয়ে যাই৷’’

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি বলেন, ‘‘শাওন স্থানীয় ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পদক ছিলেন৷’’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘শাওন নিহত হওয়ার পর লাশ পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়৷ আর মামলাও পুলিশ তাদের মতো করিয়েছে৷’’

এদিকে শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নারায়ণগঞ্জে নিহত শাওনের বাসায় গেলেও আওয়ামী লীগের পরিচিত কোনো নেতা যাননি বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানান৷

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে