বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি বিভাগ, দ্রুত সমাধানের পথ নেই

বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি বিভাগ, দ্রুত সমাধানের পথ নেই

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে এখন চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকছে দেড়-দুই হাজার মেগাওয়াট। রাজধানীসহ সারা দেশে স্থানভেদে প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে পার করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। মফস্বলের কোনো কোনো স্থানে তা কখনো ১০ ঘণ্টায় ওঠারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে গ্যাস সংকটকে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনমাফিক গ্যাস সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিগগিরই এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ মিলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম এখন বাড়তির দিকে। দাম বেশি হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ বন্ধ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি সরবরাহকারী দেশগুলো। বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার সময় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এ উদ্যোগেরও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

বিতরণ কোম্পানিগুলো এখন বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিচ্ছে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে পার করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এ বিষয়ে বিদ্যুতের একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ভাষ্য হলো দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে অন্তত সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার। এর মধ্যে নিয়মিতভাবে চালু রাখতে হচ্ছে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হলে প্রতিদিন ১৫০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাসের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরবরাহ পাচ্ছে ৯০-৯৫ কোটি ঘনফুটের মতো।

জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও। সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আগামী নভেম্বরের আগে লোডশেডিং কমার কোনো আশা নেই। গ্যাস আনতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাচ্ছি না। যতই আশাবাদী হই না কেন, এ মুহূর্তে পরিস্থিতি ভালো দেখা যাচ্ছে না। ডলারের মূল্যে, গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এবং জ্বালানি মূল্যে কোনো কমফোর্ট জোন নেই, যে কারণে এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ৯ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল ও কয়লাভিত্তিক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ১৩৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ১৯ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে কারিগরি সমস্যায় ৩১, জ্বালানিস্বল্পতায় ৫৮, রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ১৫ ও চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় ১৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সে অনুযায়ী বর্তমানে অন্তত ৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি বছরের ১৯ জুলাই থেকে ১ ঘণ্টা করে সারা দেশে শিডিউল অনুযায়ী লোডশেডিংয়ের নির্দেশনা দিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু বাকি ২৩ ঘণ্টার চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনও করা সম্ভব হচ্ছে না জ্বালানি সংকটের কারণে। এতে বিতরণ কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো লোডশেডিংয়ের শিডিউল তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব শিডিউলের বিষয়ে জানতেও পারছে না গ্রাহক। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলছেন, শিডিউল মেনে লোডশেডিং করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন, যে কারণে সেটি মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য।

বিদ্যুৎ বিতরণকারী ছয়টি সংস্থার সোমবারের লোডশেডিংয়ের শিডিউল থেকে জানা গেছে, বিপিডিবির গ্রাহক এলাকায় স্থানভেদে দিনে ৫-৬ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার কথা। এছাড়া শিডিউল অনুযায়ী ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ৪ ঘণ্টা, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ৩ ঘণ্টা এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) আওতাধীন এলাকায় ২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হওয়ার কথা। যদিও গ্রাহকদের অভিযোগ, বিতরণ কোম্পানিগুলো লোডশেডিং করছে এ শিডিউলের চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে। এমনকি রাজধানীর বাইরে কোনো কোনো এলাকায় শিডিউলের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে।

যদিও সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকেই দেশে কোনো লোডশেডিং থাকবে না বলে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে তাদের প্রত্যাশা ছিল, উল্লিখিত সময়ের মধ্যেই বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমে যাবে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে।

এসব প্রত্যাশার কোনোটিই পূরণ হয়নি। বরং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরো জটিল রূপ ধারণ করেছে। সারা দেশে এখন দৈনিক সাড়ে ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। সেখানে উৎপাদন করা যাচ্ছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা এখন ৪২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সরবরাহ হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি থাকছে ১৫০ কোটি ঘনফুটের মতো। সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট আসার কথা এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় এখন দৈনিক এলএনজি সরবরাহ নেমেছে ৩৮ কোটি ঘনফুটে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে চলতি বছরের মার্চ থেকে ৫ ঘণ্টা সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে রাত ৮টার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও কার্যকর রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সপ্তাহে দুদিন বন্ধ রাখার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার নির্দেশনা রয়েছে। এসব উদ্যোগেও বিদ্যুতের চাহিদা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং তা আগের চেয়ে অনেকাংশে বেড়েছে।

শিগগিরই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে আনার কোনো সম্ভাবনাই দেখতে পাচ্ছেন না জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, চলমান গ্যাস সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান নেই। স্থানীয় সরবরাহও রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব হবে না। আবার মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শিগগিরই স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি ক্রয় শুরুর সুযোগ নেই। জ্বালানি বিভাগও এখন এত বেশি দামে এলএনজি কিনতে আগ্রহী নয়। যেসব দেশ থেকে গ্যাস আমদানি বৃদ্ধির বা নতুন করে আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, সেসব দেশও ২০২৫ সালের আগে সরবরাহ-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া যাবে না বলে জানিয়েছে। গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিয়ে এ পরিস্থিতির মধ্যেই দিন পার করতে হবে।

আশাবাদী হতে পারছেন না বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরাও। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন এ প্রসঙ্গে

বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম না কমা পর্যন্ত এ পরিস্থিতির দ্রুত কোনো সমাধান নেই। এখন একটা সমাধান থাকতে পারে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত নিয়ে আসা গেলে। কিন্তু সেখানেও আরো কিছু সময় লাগবে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো এক-দেড় বছর সময় লাগতে পারে।

গ্যাস সংকটজনিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন জ্বালানি তেলের বাজারেও চাপ ফেলছে। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জুলাইয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গণপরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতিতে মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়েছেন ভোক্তারা। এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের ভোক্তা চাহিদা আরো বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই গ্যাসে সাশ্রয় করতে না পেরে জ্বালানি তেলভিত্তিক রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি আর্থিক চাপও এখন বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় খাতটিতে লোকসান কমাতে ক্যাপাসিটি চার্জের লাগাম টেনে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তির আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের ভর্তুকি ছাড়সংক্রান্ত এক চিঠিতে এমন নির্দেশনা দেয়া হয়।

 

সূত্র: বণিক বার্তা