ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন, আসলে কী চুক্তি হয়েছে?

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন, আসলে কী চুক্তি হয়েছে?

সিএনএন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণাটি বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনেছে। কিন্তু এরপর থেকে যা ঘটছে তা এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

হরমুজ প্রণালি এখনও কার্যত বন্ধ। লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়বে কি না তা নিয়ে পক্ষগুলো পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। আর মাঠে হামলা থামেনি।

‘কেউ জানত না ট্রাম্প কী করবেন’

মঙ্গলবার রাত ৮টার নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র তিন ঘণ্টা আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে হোয়াইট হাউসে তলব করা হয়। সিএনএনকে দেওয়া তথ্যে একাধিক সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই কেউ নিশ্চিত ছিলেন না।

সেই সময়সীমার দেড় ঘণ্টা আগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনিই লিখেছিলেন, “আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা মরবে।”

পর্দার পেছনে পাকিস্তান ও সিআইএ

কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বিকেলে এক্সে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্পকে দুই সপ্তাহ সময় বাড়ানোর আবেদন করেন এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বলেন। সূত্র জানায়, হোয়াইট হাউস আগে থেকেই এই বার্তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত ছিল।

পাকিস্তান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, সিআইএও এই অচলাবস্থা ভাঙতে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিল।

হরমুজ: ঘোষণা এক কথা, বাস্তবতা আরেক

যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। গত এক মাস ধরে ইরান এই প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট তৈরি করেছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট দাবি করেছেন, ইরান বেসরকারিভাবে প্রণালি খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে এবং জাহাজ চলাচল বেড়েছে।

কিন্তু সিএনএনের বৈশ্বিক বিষয়ক বিশ্লেষক ব্রেট ম্যাকগার্ক বুধবার ‘দ্য অ্যারেনা’য় বলেন, “আমরা ক্ষেপণাস্ত্র গুনতে পারি, ড্রোন গুনতে পারি, আর জাহাজ চলছে কি না তাও দেখতে পাই। আজকের সব সূচক অন্তত ভুল দিকেই গেছে।”

সিএসআইএসের বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সেইগলের মন্তব্য আরও স্পষ্ট: “ঘোষণা যা-ই হোক, জাহাজ পরিচালকরা যতক্ষণ না নিরাপদ মনে করবেন, পরিস্থিতি মার্চের শুরুর মতোই থাকবে।”

লেবানন: যে প্রশ্নে সবাই ভিন্নমতে

চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি লেবানন। ইরান ও পাকিস্তান বলছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতাভুক্ত। কিন্তু উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভান্স বুধবার বুদাপেস্ট ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, “ইরানীরা মনে করেছিল লেবানন অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আমরা কখনো সেই প্রতিশ্রুতি দিইনি।”

ইসরায়েল এরই মধ্যে লেবাননে যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ঘালিবাফ বলেছেন, তাঁদের ১০ দফার তিনটি শর্ত ইতিমধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে।

সামরিক প্রস্তুতি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল

সিএনএন জানতে পেরেছে, চুক্তি না হলে মার্কিন সেনাবাহিনী একটি বিশাল টার্গেট তালিকা নিয়ে প্রস্তুত ছিল — অবকাঠামো, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযানের পরিকল্পনাও তৈরি ছিল বলে ইসরায়েলি তিনটি সূত্র জানিয়েছে।

হেগসেথ বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আমাদের কাছে অবকাঠামো, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রের টার্গেট সেট প্রস্তুত ছিল।” জেনারেল কেইন জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে অভিযানে ফিরতে প্রস্তুত।

এই সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে উপরাষ্ট্রপতি ভান্স, দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন — এটি হবে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ের মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক বৈঠক।

তবে দুই সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় গভীর। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিনিধি আব্বাস আরাঘচিকে তাঁর নিজ দেশেই দুর্বল অবস্থানের মানুষ মনে করা হয়। একটি আঞ্চলিক সূত্র সিএনএনকে বলেছে, “অনেকেই তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন, কারণ তিনি কূটনৈতিক সমাধান চান।”

ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে সতর্ক করে দিয়েছেন, শর্ত পুরোপুরি না মানলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হবে।

একজন আঞ্চলিক সূত্র পুরো পরিস্থিতিকে বলছেন “সামলানোযোগ্য জগাখিচুড়ি।” আরেকটি সূত্রের ভাষায়: “তারা একটার পর একটা ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্র জেতার চেষ্টা করছে। সত্যিটা খুব শিগগিরই বেরিয়ে পড়বে।”