চীন ও রাশিয়ার এত কাছে আসার পেছনে কারণ কী?

চীন ও রাশিয়ার এত কাছে আসার পেছনে কারণ কী?

বিবিসি  বাংলা

গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে হাঁটতে হাঁটতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এমন এক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছিলেন- যেখানে অঙ্গ প্রতিস্থাপন মানুষের জীবন নাটকীয়ভাবে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

“মানুষের অঙ্গ প্রতিস্থাপন তো চলতেই পারে। আপনি যত দীর্ঘদিন বাঁচবেন, ততই তরুণ হয়ে উঠবেন, এমনকি অমরত্বও অর্জন করতে পারেন,” পুতিনের দোভাষীকে বলতে শোনা যায়।

“কেউ কেউ অনুমান করেন, এই শতাব্দীতেই মানুষ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে,” শি’র দোভাষীর জবাব।

এই খোলা মাইক্রোফোনের মুহূর্তটি তাদের সম্পর্কের একটি ঝলক দেখায়।

এটি ছিল দুই শক্তিমান নেতার জন্য আলাপচালিতা যারা একে অপরকে ‘সেরা বন্ধু’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও সরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

তাদের সম্পর্কটি যে ঠিকমতো উপলব্ধি করা হয়নি- এমন বাস্তবতা, আর তাদের অত্যন্ত গোপন সম্পর্কের অল্প কিছু ঝলকের এক বিরল নমুনা ছিল অনির্ধারিত এই কথোপকথনটি।

এই সপ্তাহে পুতিন আবার বেইজিংয়ে ফিরছেন, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ‘প্রতিবেশী হিসেবে সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা’ চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে হবে তার এই সফর।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শি’র সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাকে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তার তুলনায় পুতিনের সফর অনেকটাই নিভৃত এবং এ নিয়ে আগাম তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে খুব কমই।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্প-শি বৈঠক সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাবেন বলে আশা করছেন।

খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে জংনানহাই লিডারশিড কম্পাউন্ডে (যেখানে শি এবং চীনের শীর্ষ নেতারা বসবাস করেন ও সেখান থেকে কাজকর্ম পরিচালনা করেন) হাঁটার সময় ট্রাম্পের একটি প্রশ্নের উত্তরে শি তার বন্ধু পুতিনের কথা উল্লেখ করেন এবং মজা করে বলেন, পুতিন আগেই এই রাজনৈতিক কেন্দ্রে এসেছেন, যা সাধারণত বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত নয়।

ওয়াশিংটনের কেউ কেউ যদিও আশা করেছিলেন যে ট্রাম্প বেইজিংকে মস্কো থেকে দূরে সরিয়ে আনতে পারেন, কিন্তু সে আশা এখন কল্পনাপ্রসূত বলেই মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়া তাদের সম্পর্ককে “সীমাহীন বন্ধুত্ব” বলে বর্ণনা করেছে। তবে এর ভিত্তি কী এবং এই সম্পর্ক কতদিন টিকবে?

চীনের শর্ত

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভ বলেন, এই সম্পর্ক অত্যন্ত অসম এবং দুই দেশের মধ্যে হওয়া যে কোনো চুক্তিই সম্ভবত চীনের শর্তে হবে।

তিনি বলেন, “রাশিয়া পুরোপুরি চীনের প্রভাবে আছে এবং শর্ত নির্ধারণ করতে পারে চীন।”

এই প্রবণতা অর্থনীতিসহ বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়। চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র চার শতাংশ রাশিয়ার সঙ্গে।

চীন অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় রাশিয়ায় বেশি পণ্য রফতানি করে এবং তাদের অর্থনীতি রাশিয়ার তুলনায় অনেক বড়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা এবং যুক্তরাজ্যের ৫জি বা ফাইভজি নেটওয়ার্ক থেকেও বাদ পড়া হুয়াওয়ে এখন রাশিয়ার টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হওয়ায় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও শিল্প – সব ক্ষেত্রেই চীন এখন রাশিয়ার প্রথম ভরসা।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসনের পর থেকে রাশিয়া তার যুদ্ধযন্ত্রের জন্য চীনা উপাদানের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাশিয়া তার নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে আমদানি করছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি।

এই বৈষম্যের ঝুঁকি রাশিয়া ভালো করেই জানে। ‘উই বো টু নো ওয়ান’ বা ‘আমরা কারো কাছে মাথাননত করি না’- শিরোনামে লেখা সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি দিমিত্রি ট্রেনিন বলেন, রাশিয়া কোনোভাবেই অধীনস্ত রাষ্ট্র হতে চায় না।

চীন সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের সম্পর্ক সমান ভিত্তিতে রাখতে হবে এবং মনে রাখতে হবে রাশিয়া একটি বৃহৎ শক্তি, যা কোনো জুনিয়র অংশীদার হতে পারে না।”

বেইজিংয়ের বাইরে মস্কোর কার্যকর বিকল্প খুব কম—এমন এক ক্রেতা যেটি রাশিয়ার টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য বাজার এবং চাহিদা প্রদান করে।

বেইজিংয়ের বিকল্প হিসেবে মস্কোর হাতে খুব বেশি কার্যকর কিছু নেই। কারণ বেইজিং এমন এক ক্রেতা যার কাছ থেকে রাশিয়ার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য চাহিদা ও বাজারের জোগান পাওয়া যায়।

আর পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা বিবেচনা করে চীন যদি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দেয়, তবে তা রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্যগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে জটিল করে তুলবে।

তবে, মস্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা এবং বেইজিংয়ের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল হলো নিজের অবস্থানে অটল থাকার ক্ষমতা।

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক প্রভাষক মারচিন কাচমারস্কি’র মতে, চীন এই অসমতার মাত্রা সম্পর্কে জানে এবং রাশিয়ার ভেতরে বা তার অভিজাত গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে অনিচ্ছুক।

“আমি বলব, রাশিয়ার প্রতি চীনের নীতির সারসংক্ষেপ হলো- সংযম প্রদর্শন,” তিনি আরো বলেন, “চীন রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে না”।

এর একটি কারণ হলো- এটি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। রাশিয়া হয়তো অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশীদার, কিন্তু এটি একই সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন একটি রাষ্ট্র।

কার্নেগির গাবুয়েভ বলেন, এমনকি চীন যদি রাশিয়াকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করে, তবুও এটি “তৎক্ষণাৎ তা মেনে নেওয়ার মতো দেশ নয়”।

তিনি ২০২৩ সালে শি জিনপিংয়ের মস্কো সফরের উদাহরণ দেন। ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট নাকি পুতিনকে ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই রাশিয়া ঘোষণা দেয়, তারা বেলারুশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করবে।

অনেকেই এই পদক্ষেপকে বাহ্যিক চাপের প্রতি মস্কোর সচেতন প্রতিরোধ এবং তাদের স্বাধীন অবস্থান স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।

ইউক্রেনে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অনেক দিক থেকে তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ালেও, সম্ভাব্য তাইওয়ান আক্রমণ নিয়ে বেইজিং যখন তার বিকল্পগুলো বিবেচনা করছে, তখন তা চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবেও কাজ করছে।

গাবুয়েভ বলেন, “রাশিয়া এখনো কিছু সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যেমন বিশেষায়িত সরঞ্জাম। তারা সেগুলো বিক্রি করতে সক্ষম। পাশাপাশি চীনের কিছু সরঞ্জাম বা উপাদান পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে।”

এছাড়া, রাশিয়ার রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ যা চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিন বলেন, তেল ও গ্যাসে সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ “খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতির দিকে” এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি সম্ভবত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইনের কথাই উল্লেখ করছিলেন, যার জন্য বহু বছর ধরে স্থগিত থাকা আলোচনার পর রাশিয়ার বড় গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম এবং চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে জানা যায়।

পাইপলাইনটি নির্মিত হলে তা পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এটি দিয়ে মঙ্গোলিয়ার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে বছরে ৫০০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস চীনে সরবরাহ করা হবে।

আর হরমুজ প্রণালিতে সংকট অব্যাহত থাকায়, রাশিয়ার জ্বালানির ওপর চীনের এই বিনিয়োগ এখন সুফল দিতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে।

এটি শুধু দামের বিষয় নয়; বরং ক্রমবর্ধমান অস্থির বিশ্বের প্রেক্ষাপটে চীনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত।

অংশীদার, মিত্র নয়

চীন ও রাশিয়ার মধ্যে যখনই মতবিরোধের ইঙ্গিত দেখা যায়, তখন তাদের সম্পর্কের একটি মৌলিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; কোনো দেশই অন্যটির অনুসরণ করতে বাধ্য নয়, কারণ তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো জোট নেই।

মস্কোতে অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের সাবেক ডেপুটি প্রধান বোবো লো বলেন, সামরিক জোটের কঠোর কাঠামোর চেয়ে এই কৌশলগত নমনীয়তাই তাদের অংশীদারিত্বকে টেকসই করে তুলেছে।

তিনি বলেন, “এটি কোনো জোট নয়, বরং একটি নমনীয় কৌশলগত অংশীদারিত্ব,” যা ভেঙে পড়ার একাধিক পূর্বাভাস সত্ত্বেও টিকে রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা সাধারণত চীন-রাশিয়া অংশীদারিত্বকে দুইভাবে তুলে ধরেছেন- হয় এটি “কর্তৃত্ববাদী শক্তির অক্ষ”, যা মূলত পশ্চিমকে পরাস্ত করার আকাঙ্ক্ষায় ঐক্যবদ্ধ; অথবা এটি একটি ভঙ্গুর সম্পর্ক, যা যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কিন্তু এ দুটির কোনোটিই পুরোপুরি তুলে ধরে না- কীভাবে এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রমেই প্রতিস্থাপন করা কঠিন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যারা অসমতা ও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ভাগাভাগি করে।

লো’র মতে, পশ্চিমের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত হলেও, একে অপরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এই দুই দেশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের চার হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যৌথ সীমান্ত, যা অতীতে অনিশ্চয়তার উৎস ছিল।

এরপর রয়েছে তাদের পরিপূরক অর্থনীতি- রাশিয়া তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য কাঁচামালের বড় রপ্তানিকারক; আর চীনের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি এগুলোর জন্য একটি বিশাল বাজার সরবরাহ করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের যৌথ বিরোধিতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।

পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নয়, যারা মানবাধিকারসহ বিভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, রাশিয়া ও চীন একে অপরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়ন বা সমালোচনা করে না।

চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে বার বার বড় পরিসরের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, যা চীন অস্বীকার তা করে এবং রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির মৃত্যুর ঘটনার কারণে কিছু পশ্চিমা দেশ এই দু’টি দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় আরও সতর্ক হয়েছে; কিন্তু মস্কো ও বেইজিং এসব ইস্যুকে এড়িয়ে যায়।

গাবুয়েভ বলেন, “শিনজিয়াং ইস্যু, নাভালনির বিষক্রিয়া ঘটনা ইত্যাদি নিয়ে তারা একে অপরের সমালোচনা করে না” এবং “জাতিসংঘে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই একমত হয়… যা একটি স্বাভাবিক পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্ক তৈরি করে”।

তিনি আরও যোগ করেন, দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যও রয়েছে। “আরও বাস্তববাদী সম্পর্কের দিকে এই প্রবণতা… সোভিয়েত যুগের আন্দ্রোপভ, চেরনেঙ্কো, গরবাচেভ, ইয়েলৎসিনের সময় থেকেই শুরু হয়েছে,” তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, চীনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে”।

এই সম্পর্ক কতদিন স্থায়ী হবে, সে সম্পর্কে একজন চীনা বিশ্লেষক, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, স্বীকার করেন- চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য জুটি হিসেবে উভয় দেশের প্রকাশ্যে উপস্থাপন আংশিকভাবে কৌশলগত প্রদর্শন, যার লক্ষ্য ঐক্য ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি তুলে ধরা।

বাস্তবে, এটি একটি কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা মাঝেমধ্যে স্বার্থগত পার্থক্যকে আড়াল করতে সাহায্য করে। উভয় সরকারই যাকে “পশ্চিমা আধিপত্য” হিসেবে দেখে তার বিরোধিতা করে, তবে এই বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।

বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়া এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে যাবে, কিন্তু চীন তুলনামূলকভাবে আরও সতর্ক ও বাস্তবধর্মী অবস্থান গ্রহণ করে। বেইজিংকে প্রায়ই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এড়িয়ে ধৈর্য ও ধাপে ধাপে অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার দিতে দেখা যায়।

তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি চীনের প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন যে বেইজিং তাদের প্রতিক্রিয়ায় সংযত ছিল এবং ট্রাম্পের সফরের প্রস্তুতি বাতিল করেনি।

তারা আরও বলেন, “এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে বেইজিং উত্তেজনা বাড়াতে চায় না এবং দরজা বন্ধ করতে চায় না”।

তাদের ভাষায়, চীন এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এড়াতে আগ্রহী, যা রাশিয়ার পদ্ধতির সঙ্গে স্পষ্টতই ভিন্ন।

মানবিক দিক

অংশীদারিত্বকে প্রায়ই ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়, কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই সমাজের মানুষের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা।

উপর থেকে দেখলে, পুতিন এবং শি নিজেদের মধ্যে তুলনাহীন বন্ধুত্বের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এটি পুতিনের ২৫তম চীন সফর এবং ধারণা করা হয় রাশিয়ার আমলারা অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের তুলনায় চীনের সমকক্ষদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখেন।

তবে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে এই ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, চীনে সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক চার্লস পার্টন সাধারণ চীনা ও রাশিয়ানদের মধ্যে স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “চীনারা কি মস্কোতে পড়াশোনা করতে যেতে চায়, সেখানে বসবাস করতে চায় এবং মস্কোতে ফ্ল্যাট কিনতে চায়? না”।

তার মতে, সুযোগ পেলে রাশিয়ানরা বরং পশ্চিমে বিনিয়োগ করতে পছন্দ করে এবং বেইজিংয়ের পরিবর্তে প্যারিস, লন্ডন বা সাইপ্রাসে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়।

সবাই এ বিষয়ে একমত নন। গাবুয়েভের মতে, দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ দ্রুত বাড়ছে, যার পেছনে আংশিকভাবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপের কঠোর ভিসানীতি রাশিয়ানদের চীনের দিকে ধাবিত করছে।

রাশিয়ানদের জন্য চীনে ভ্রমণ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। পারস্পরিক ভিসামুক্ত ব্যবস্থা থাকায়, মস্কো থেকে প্রতিদিনের একাধিক ফ্লাইটে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের প্রধান শহরগুলোতে পৌঁছানো যায়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর বিশেষ করে মস্কোর বিরুদ্ধে, রাশিয়ানরা ক্রমেই বেশি করে চীনা ফোন ব্যবহার করছে এবং চীনা গাড়ি চালাচ্ছে।

গাবুয়েভ বলেন, “এই পারস্পরিক সংযোগ, ভিসামুক্ত ভ্রমণ, এবং অর্থপ্রদান ও সহজ চলাচল চীনকে আগের তুলনায় অনেক বেশি কাছাকাছি এনে দিয়েছে”।

তিনি আরও বলেন, “আর বিভিন্ন বিনিময় কর্মসূচি, বৃত্তি এবং যৌথ গবেষণা উদ্যোগ দুই সমাজকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে”।

মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিলেও, স্বল্পমেয়াদে এই সম্পর্ক ভেঙে পড়বে- এমন পূর্বাভাস বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।

দু’দেশের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, লো বলেন, “চীন-রাশিয়া অংশীদারিত্ব এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। উভয় পক্ষই স্বীকার করে যে এই সম্পর্ক ব্যর্থ হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার মতো কার্যকর কোনো বিকল্প তাদের সামনে নেই।”

সূত্র: বিবিসি