গাজীপুর কণ্ঠ, খেলা ডেস্ক
প্রতিপক্ষ নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার মাঝেই দারুণ এক গোল করে চমকে দিল ডিআর কঙ্গো। সেই ধাক্কা সামলে নিতে একটু সময় নিল ইংল্যান্ড, এরপর আক্রমণে ঝড় তুলল তারা। কিন্তু অপেক্ষার আর শেষ হয় না। অনেক প্রচেষ্টা বিফলে যাওয়ার লিওনেল এমপাসির দুর্ভেদ্য দেয়ালে ফাটল ধরালেন হ্যারি কেইন। খানিক বাদে তিনিই দুর্দান্ত আরেকটি গোল করে দলকে নিলেন শেষ ষোলোয়।
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেন্স স্টেডিয়ামে বুধবার শেষ বত্রিশের ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতেছে ইংল্যান্ড।
পুরো ম্যাচে প্রায় ৬০ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৬টি শট নিয়ে নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখতে পারে ইংল্যান্ড। আর প্রথমবার ডিআর কঙ্গো নামে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া দলটির সাত শটের দুটি ছিল লক্ষ্যে।
দেশটি এর আগে একবার জায়ার নামে বিশ্বকাপে খেলেছিল, ১৯৭৪ সালের সেই আসরে তারা তিন ম্যাচ খেলে সবগুলো হেরেছিল।
বিশ্ব মঞ্চে প্রথমবার নকআউটে সুযোগ পেয়ে, মাঠে নেমেই স্বপ্নের শুরু পেয়ে যায় ডিআর কঙ্গো। সপ্তম মিনিটে ডান দিক থেকে শচেল বিম্বার ক্রস ডি-বক্সে ফাঁকায় পেয়ে, জোরাল শটে কাছের পোস্ট ঘেঁষে লক্ষ্যভেদ করেন সিপিঙ্গা। তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আশেপাশে কোনো ইংলিশ ফুটবলারকে দেখা যায়নি!
গত অক্টোবরে জাতীয় দলে অভিষিক্ত এই লেফট-উইঙ্গার এই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলের স্বাদ পেলেন। হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের নকআউটে দেশটির প্রথম গোলদাতা।
প্রথম ‘হাইড্রেশন ব্রেক’- এর আগের বাকি সময়েও ইংলিশদের রক্ষণে চাপ ধরে রাখে আফ্রিকান দলটি। যদিও আর কোনো শট নিতে পারেনি তারা; তবে পজেশন হারালেই তা পুনরুদ্ধারে তাদের মরিয়া হয়ে ওঠাটা ছিল দেখার মতো।
বিরতি থেকে ফেরার পর, ধীরে ধীরে চাপ বাড়াতে থাকে ইংল্যান্ড। ৩০তম মিনিটে গোলও পেতে পারতো তারা। ডেক্লান রাইসের ক্রসে জোরাল হেড নেন জুড বেলিংহ্যাম, এবং অসাধারণ নৈপুণ্যে সেটা রুখে দেন গোলরক্ষক।
ছয় মিনিট পর আবার ভীতি ছড়ায় ইংল্যান্ড এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় এগিয়ে থাকে কঙ্গো। প্রথমে দারুণ ট্যাকলে হ্যারি কেইনকে শটই নিতে দেননি আক্সেল তুয়ানুজিবি। মুহূর্ত বাদে, কাছের পোস্টে শট নেন মার্কাস রাশফোর্ড, গোলরক্ষক অন্যপাশে সরে ছিলেন, তবে গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা।
কিছুক্ষণ পর ইংলিশদের আরেকটি আক্রমণের সময় বিতর্কিত ঘটনার সুত্রপাত হয়, দ্রুত এগিয়ে স্লাইড করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি, তার হাতে লেগে পড়ে যান কেইন, পেনাল্টির জোরাল আবেদন করে ইংল্যান্ড, যদিও রেফারির সাড়া মেলেনি। ভিএআরও রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
ওই হতাশার মাঝেই দ্বিতীয় গোল হজম করা থেকে বড় বাঁচা বেচে যায় ইংল্যান্ড; ইয়োয়ান উইসার কাছ থেকে নেওয়া শট লাগে পোস্টে।
বিরতির আগের বাকি সময়ে আরও দুবার গোল পাওয়ার খুব কাছাকাছি গিয়েও, সফল হয়নি ইংল্যান্ড, এবং কঙ্গোকে এগিয়ে রাখার পুরো কৃতিত্ব এমপাসির। বেলিংহ্যামের আরেকটি হেড অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় রুখে দেওয়ার পর, কেইনের ভলিও আটকে দেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে ইংল্যান্ড। সময় গড়ানোর সঙ্গে আরও মরিয়া হয়ে উঠতে থাকে তারা। সুযোগও পাচ্ছিল দলটি, কিন্তু সাফল্য মিলছিল না।
৫৩তম মিনিটে আবার সুযোগ আসে ইংলিশদের সামনে এবং আবারও এমপাসির বীরত্বের দেখা মেলে। এবার তিনি কিছুটা ভারসাম্য হারালেও, দারুণ ক্ষিপ্রতায় বেলিংহ্যামের প্রচেষ্টা রুখে দেন।
ডিআর কঙ্গোর জমাট রক্ষণ আর এমপাসির মজবুত দেয়ালে কেইন-বেলিংহ্যামদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল, আর ডাগআউটে কোচ টমাস টুখেলের চোখে-মুখে অস্থিরতা বাড়ছিল।
অবশেষে, ৭৫তম মিনিটে এমপাসির প্রাচীরে ফাটল ধরাতে পারে ইংল্যান্ড। বাঁ দিক থেকে গর্ডনের ক্রস ছয় গজ বক্সে পেয়ে, হেডে সমতা টানেন কেইন। ঝাঁপিয়ে এবারও বলে হাত লাগাতে পারেন এমপাসি, কিন্তু পারেননি আটকাতে।
নির্ধারিত সময়ের চার মিনিট বাকি থাকতে চমৎকার এক গোলে ব্যবধান গড়ে দেন কেইন।
বেলিংহ্যামের আরেকটি প্রচেষ্টা গোলরক্ষক আটকে দেওয়ার পর, ফিরতি বল ধরে ডি-বক্সের বাইরে কেইনকে বাড়ান গর্ডন। এরপর, বায়ার্ন মিউনিখ তারকা বলের প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি রেখে ডি-বক্সে ঢুকে, পোস্টের দিকে একবার না তাকিয়ে নেন জোরাল শট, বুলেটের গতিতে বল খুঁজে পায় ঠিকানা।
চলতি আসরে পাঁচটিসহ বিশ্বকাপে কেইনের মোট গোল হলো ১৩টি। জাতীয় দলের হয়ে ১১৮ ম্যাচে তার গোল হলো ৮৪টি।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার গোল হলো পাঁচটি, ছাড়িয়ে গেলেন জিওফ হার্স্টকে (৪)। এই তালিকায় কেইনের সামনে এখন কেবল গ্যারি লিনেকার (৬)।
এই আসরেই গ্রুপ পর্বে তিনটি গোল করার পথে, লিনেকারকে (১০) ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন কেইন।
অন্তিম সময়ে ডি-বক্সের বাইরে উইসাকে ফাউল করে বসেন বেলিংহ্যাম। অজানা শঙ্কা হয়তো জেঁকে বসেছিল ইংলিশ সমর্থকদের মনে। তবে ফ্রি-কিকটা লক্ষ্যে রাখতে পারেননি উইসা, এরপরই বাজে শেষের বাঁশি। একইসঙ্গে স্বস্তি আর আনন্দের হাসি ফোটে ইংলিশদের চোখে-মুখে।
বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করা আগের ১৩টি ম্যাচে জিততে পারেনি ইংল্যান্ড, সেই গেরো এবার কাটাতে পারল তারা। এর আগে সবশেষ, কোনো ম্যাচে প্রথমে পিছিয়ে পড়ে তারা জিতেছিল ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই, পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে।
কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ইংল্যান্ড খেলবে দারুণ ছন্দে থাকা মেক্সিকোর বিপক্ষে। আসরে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচের সবকটি জিতেছে সহ-আয়োজকরা। আট গোল করার বিপরীতে একটিও হজম করেনি তারা। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে ম্যাচটি হবে বাংলাদেশ সময় আগামী সোমবার সকালে।