কালীগঞ্জে স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, তদন্তে ধরা পড়তেই ‘ডিভোর্স’

সিএজি কার্যালয় অর্থ আত্মসাতে জড়িত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

কালীগঞ্জে স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, তদন্তে ধরা পড়তেই ‘ডিভোর্স’

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইউসুফ হাবিব তাঁর স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সরকারি অনুদানের প্রায় সাড়ে বারো লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য—দম্পতির মধ্যে ইতিমধ্যে বিবাহবিচ্ছেদও হয়ে গেছে। এ সংবাদ প্রকাশ করেছে সমকাল পত্রিকা।

সিএজি কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধজাত পণ্য (ডেইরি) উন্নয়নের একটি প্রকল্পে সরকারের প্রায় ৬৭ কোটি টাকার নিরীক্ষা আপত্তি দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটিতে সুনির্দিষ্ট ১৭টি ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির আভাস পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সিএজি কার্যালয় অর্থ আত্মসাতে জড়িত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে।

এরমধ্যে ‘ম্যাচিং গ্র্যান্ট’ নামের একটি প্রকল্প ছিলো কালীগঞ্জে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ‘ম্যাচিং গ্র্যান্ট’ আত্মসাতের জন্য অভিনব কৌশল নেন ডা. ইউসুফ হাবিব। খামারি ও ডেইরি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে দেওয়া এই অনুদানের প্রায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা তিনি তাঁর তৎকালীন স্ত্রী কালীগঞ্জ পৌর যুব মহিলা লীগ নেত্রী ও সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর (৭, ৮, ৯ নং ওয়ার্ড) কান্তা ভূইয়ার নামীয় ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অনুমোদন করিয়ে নেন। অথচ অডিট দল সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায়, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে অস্তিত্ব নেই, এমনকি কান্তা পেশাদার খামারিও নন।

জানতে চাইলে কান্তা সমকালকে বলেন, ২০২৫ সালে তিনি ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অনুদান পান। সে সময় ইউসুফ হাবিব তাঁর স্বামী ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তিনিই তৈরি করে দেন। কান্তার ভাষ্যে, বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, টাকা প্রথমে তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা হলেও পরে ইউসুফ তা নিজের হিসাবে সরিয়ে নেন। এমনকি ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁদের নিজেদের বাসাতেই সাজিয়ে মিঠাই ঘরের কিছু ছবি তোলা হয় বলেও তিনি জানান।

জানতে চাইলে ডা. ইউসুফ হাবিব সমকালকে বলেন, প্রকল্পের নিয়ম মেনেই অনুদান অনুমোদন করা হয়। তিনি দাবি করেন, কান্তাকে পরে কিছু যন্ত্রপাতি কিনতে দেখেছেন তিনি, তবে তালাকের পর থেকে কান্তা মিথ্যা কথা বলছেন। 

উল্লেখ্য, তিনি বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (লিভ, ডেপুটেশন অ্যান্ড ট্রেনিং রিজার্ভ পদ) হিসেবে কর্মরত।

সিএজি প্রতিনিধি দলের সরেজমিন পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলার বর্তমান প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহমুদুল হাসান। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, তিনি এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দেখতে পাননি।

কান্তার নামে অনুদানের আবেদন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মুলগাঁও ও বাঘারপাড়া—এই দুটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। তদন্তে দুই এলাকাতেই ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের হদিস মেলেনি।

২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)’-তে বিশ্বব্যাংকের ৩ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা ঋণসহ মোট ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, তবে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার ৪৬৫টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলমান।

শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে অকেজো পাম্প মোটর কেনা, বেশি দামে গাড়ি ক্রয়, টেন্ডারে কারসাজি করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অনুদান বিতরণ করে অর্থ আত্মসাতের চিত্রও উঠে এসেছে।