ফিফার সঙ্গে সংঘাতে উয়েফা, বয়কটের হুমকি বিশ্বকাপে

বিতর্কের মূলে রয়েছে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা।

ফিফার সঙ্গে সংঘাতে উয়েফা, বয়কটের হুমকি বিশ্বকাপে

গাজীপুর কণ্ঠ, খেলাধুলা ডেস্ক

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা জানিয়ে দিয়েছে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি অর্থায়ন পরিকল্পনা কার্যকর হলে উয়েফা ও এর সদস্যভুক্ত জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ব্রিটিশ সময় বিকেল ৪টায় এই ঘোষণা আসার পর ইউরোপীয় ফুটবল অঙ্গনে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বিতর্কের মূলে রয়েছে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকবে, তবে অর্থায়নের একাংশ আসবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, যাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারও।

অনিশ্চয়তায় নারী বিশ্বকাপ

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ফুটবলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এর বাস্তব প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই টুর্নামেন্টে ইউরোপের একাধিক দেশও অংশ নেবে।

তবে ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত অর্থায়ন চুক্তি অনুমোদিত হলেই কেবল বয়কটে যাবে উয়েফা। ফিফার সদস্য দেশগুলোকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জানাতে হবে, তারা এই পরিকল্পনায় সম্মত কি না। সম্মতি দিলে আগামী ১ জানুয়ারি প্রতিটি সদস্য পাবে দুই কোটি ডলার (প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড) করে।

এই সময়সীমার মধ্যে বয়কট কার্যকর হলে চলমান নারী বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনাল বা সেমিফাইনালের আগেই কিছু দেশ সরে দাঁড়াতে পারে। ফিফার পরবর্তী বড় আসর অক্টোবরে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ, যেখানে খেলবে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড।

উয়েফার সহসভাপতি ও ওয়েলসের সাবেক ফুটবলার লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে বলেন, শরতে প্লে-অফে খেলবে ওয়েলস, আর মূল পর্বে উঠতে পারলে সেটিই হবে দলটির প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। তিনি জানান, এই সংকটের জন্য উয়েফা দায়ী নয়, বরং এটি তৈরি করেছে ফিফা নিজেই, এবং উয়েফাকে একরকম কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

উয়েফার ঘোষণার পর ফিফা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর মধ্যে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের ৪১ সদস্যই ফিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিরোধিতা এসেছে ফিফার অভ্যন্তর থেকেও। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও ফিফার সহসভাপতি ডেবি হিউইট বৃহস্পতিবার উয়েফার জরুরি বৈঠকে প্রকাশ্যেই পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করেন। স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা উয়েফার অবস্থানের সঙ্গে পূর্ণ একমত।

সমালোচকদের অভিযোগ শুধু প্রস্তাবটি নিয়েই নয়, বরং সহকর্মীদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই ইনফান্তিনো এটি সামনে এনেছেন—সে বিষয়েও। উয়েফার বৈঠকের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে এক সূত্র এক শব্দে জবাব দেন, “ক্ষোভ।”

২০১৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি শেখ সালমান আল-খলিফাকে হারিয়ে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন ইনফান্তিনো। আগামী মার্চে চতুর্থ মেয়াদের জন্য তার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা। এত দিন ধারণা করা হচ্ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই তিনি পুনর্নির্বাচিত হবেন। তবে একাধিক সূত্রের ভাষ্য, নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের জেরে তার সক্ষমতার ওপর আস্থা হারাচ্ছে ফিফার সদস্য সংস্থাগুলো, ফলে তার বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করানোর আলোচনাও শুরু হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নাম হিসেবে উঠে এসেছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) সভাপতি ও কাতারের প্রভাবশালী ব্যক্তি নাসের আল-খেলাইফির নাম। তবে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, তিনি এই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন।

ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনের মন্তব্য, সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান হলে এত বড় বিতর্কের পর সভাপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হতো, তবে জাতীয় সংস্থাগুলোর যথেষ্ট সমর্থন থাকলে ইনফান্তিনো পদে টিকে যেতে পারেন। উয়েফার সাবেক প্রধান নির্বাহী লার্স-ক্রিস্টার ওলসন বলেন, ইনফান্তিনো এই ইস্যুতে বড় ঝুঁকি নিয়েছেন এবং তার পদও এখন হুমকির মুখে। ফিফা সভাপতির পদ মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে পালাক্রমে হস্তান্তরের সংস্কার প্রস্তাব করেন তিনি, যাতে একজনের হাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়।

ভাঙনের শঙ্কা, তবে সমাধানের আশাও

ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে উয়েফার সদস্যসংখ্যা মাত্র ৫৫টি হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে সবচেয়ে শক্তিশালী মহাদেশীয় সংস্থা এটিই। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা চার দলের তিনটিই ছিল উয়েফাভুক্ত। ফিফার প্রতিযোগিতায় ইউরোপের অনুপস্থিতি ঘটলে এর বাণিজ্যিক ক্ষতি হবে ব্যাপক, বিশেষত ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত চার হাজার কোটি ডলারের প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে ডেভিড বার্নস্টেইন মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ফুটবল দুই ভাগে বিভক্ত হবে না, কারণ তাতে উভয় পক্ষেরই ক্ষতি। তার মতে, এই মুহূর্তে ইনফান্তিনোকেই পিছু হটতে হবে, কারণ প্রস্তাবিত চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য নয় এবং মূলধন সংগ্রহের আরও ভালো উপায় রয়েছে।