গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালের তিব্বত সীমান্তের এক অঞ্চলে হড়পা বান ও ভূমিধসে অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষ। তাদের মধ্যে দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক ও নিরাপত্তা সদস্য রয়েছেন।
বুধবার (২৬ অগাস্ট) সকালে উত্তর নেপালের পাহাড়ি ভোতে কোশি নদীতে হড়পা বান দেখা দেয়। এর জেরে তিব্বত সীমান্তের কাছে রসুয়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নদীতে আকস্মিক পানি বেড়ে এবং কাদাস্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, যানবাহন, সেতু এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকার দুই পাশেই উদ্ধার অভিযান চলছে এবং এ পর্যন্ত ৮৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো এ পর্যন্ত ৯৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নেপাল প্রশাসন জানায়, তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া রাসুয়া জেলার স্যাব্রুবেসি ও তিমুর এলাকায় এই হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু যানবাহন, ব্যবসায়িক পণ্য এবং অন্যান্য সম্পত্তি পানির তোড়ে ভেসে গেছে।
বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা নাগাদ ওই অঞ্চলের ভোতে কোশি নদী পানি হঠাৎ করেই মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিব্বতের দিক থেকে এই বন্যার পানি প্রবেশ করে থাকতে পারে।
প্রাণহানি বা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে এখনও বিভিন্ন দল পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে এবং তথ্য সংগ্রহ করছে।
তিব্বত নিয়ন্ত্রণকারী চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে। নেপালি কর্মকর্তারাও “বিশাল আকারের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির” আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, প্লাবিত এলাকায় থাকা ২৯১ জন বিদেশি পর্যটক এবং গাইডসহ ৯৩ জন নেপালি নাগরিকের সন্ধান পেতে কাজ চলছে। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের নাগরিক রয়েছেন।
ওদিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানান, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬ জন পুলিশ সদস্য, ৯ জন সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর ৪৪ জন সদস্য রয়েছেন।
ভোতে কোশি নদীর ভাটির বেশ কয়েকটি এলাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সংযোগকারী প্রধান সড়কসহ ওই অঞ্চলের সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে, কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলি বাজার এলাকায় নদীর পানি হঠাৎ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
পানির প্রবল তোড়ে একটি সেতু ভেসে যায় এবং নদীর তীরবর্তী একাধিক বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক চীনা ব্যবসায়ী ইই লিয়াং বিবিসি-কে জানান, ওই এলাকায় থাকা তার পরিবহন কোম্পানির সাতটি কন্টেইনার ট্রাকের নেপালি চালক ও কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “সেখানে কোনও নেটওয়ার্ক নেই। পূর্ববর্তী ছোটখাটো ধসগুলোর চেয়ে এবারের বন্যা অনেক বেশি ভয়াবহ।”
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসনেত জানান, মাইলুং গ্রাম থেকে ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া তিমুর, স্যাব্রুবেসি এবং বেত্রাবতী গ্রামে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছে নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জরুরি বৈঠকের পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, “চিকিৎসক দল, স্কাউট ও রেড ক্রসের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে।”
ঝুঁকিপূর্ণ নদী তীরের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপালি কর্তৃপক্ষ দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে হেলিকপ্টার পাঠানোর চেষ্টা করলেও তীব্র বাতাসের কারণে উদ্ধারকারী উড়োজাহাজগুলো পৌঁছাতে বাধা পাচ্ছে।
গেল বছরও রসুয়া এলাকায় চীনের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ গলে সৃষ্ট বন্যায় ১৮ জন মারা গিয়েছিলেন। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবারের এই দুর্যোগের ভয়াবহতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।