গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
ফ্যাসিবাদী আমলের দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একে একটি ঐতিহাসিক ও বিশাল সম্ভাবনার দ্বার বলে অভিহিত করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান
বিজ্ঞপ্তিতে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ নিয়ে নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এড়াতে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা জানিয়ে দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি না করা পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল টেস্ট বা পাসপোর্ট জমা দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন। এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বাজার উন্মুক্তকরণের পথ সুগম হয়েছে।
সমঝোতা স্মারক ও রিক্রুটিং এজেন্সির নতুন বিন্যাস
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত ছিল। বর্তমান সরকার মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনি শর্তাবলি ও নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের স্বার্থ আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী প্রধান ৫টি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি তালিকার অন্তর্ভুক্ত। তবে বর্তমান সরকারের দৃঢ় অনুরোধে ফ্যাসিবাদের সময় সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে অবশিষ্টদের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
দীর্ঘ ৬ মাসের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে মালয়েশিয়া সরাসরি নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। এর সঙ্গে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)—সহ মোট ৩৩৮টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে, যা দেশের জনশক্তি রপ্তানি ইতিহাসে এক বিরল অর্জন। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি এই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছে।
জিরো কস্টে কর্মী প্রেরণ ও বিমান চলাচল
বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয়মুক্ত এই কর্মীদের প্রথম বহর বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে পুনরায় এই শ্রমবাজারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
মেডিকেল সেন্টারের নতুন তালিকা
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বিদ্যমান তালিকা থেকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল বিতর্কিত মেডিক্যাল সেন্টার বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি অনুমোদিত সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করবে।
নিরাপত্তা ও মনিটরিং সেল
কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে যোগদান এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। যেকোনো অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হবে।