দলীয়করণের অভিযোগ তুলে স্থানীয় নির্বাচন বর্জন করতে পারে জামায়াত জোট

ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং তাদের সাবেক রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়েছে। জামায়াত জোট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে–রাষ্ট্রীয় সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না।

দলীয়করণের অভিযোগ তুলে স্থানীয় নির্বাচন বর্জন করতে পারে জামায়াত জোট

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক 

প্রতিশ্রুত সংস্কার কাজ শেষ না করা, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে বিরোধী দলীয় জোট। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) যদি ‘দলীয় লোক’ বসানো থাকে, তবে আগামীতে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব কি না–তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট জানিয়েছে, ইসিতে এই দলীয় নিয়োগ বাতিল না করা হলে তারা আগামী দিনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের কথা ভাবছে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত সচিব মো. শামসুল আলমকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে প্রয়োজনে ইসি ঘেরাওয়ের মতো কঠিন কর্মসূচি দেওয়ার কথাও চিন্তা করছেন জোটের নেতারা।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং তাদের সাবেক রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়েছে। জামায়াত জোট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে–রাষ্ট্রীয় সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না।

জোটের অন্যতম প্রধান দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সংসদে এবং রাজপথে সরকারের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জোটের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করার পাশাপাশি তরুণদের এই দলটি নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও মাঠে সক্রিয় থাকবে।

তবে এখনই ১১ দলীয় জোট ভাঙার কোনো ইচ্ছা জামায়াত বা তাদের সঙ্গীদের নেই। বরং ঐক্যবদ্ধ থেকে আন্দোলন চালিয়ে সংস্কার ও সুশাসনের ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে চায় তারা।

সম্প্রতি জামায়াত ও এনসিপির নানা রাজনৈতিক তৎপরতা এবং দল দুটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেই জায়গা থেকে জামায়াত একচুলও সরবে না। রাজপথ কিংবা সংসদ-সব জায়গাতেই আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। সংস্কারের অভাব, দলীয়করণ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা ইতিমধ্যে লংমার্চসহ নানা কর্মসূচির কথা জানিয়ে দিয়েছি।’

তবে তাদের সাবেক মিত্রের এই কঠোর রূপকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সাধারণত সরকার ও বিরোধী দলের চিন্তাভাবনায় কিছুটা পার্থক্য থাকেই। হয়তো সেই জায়গা থেকেই তারা এমন কথাবার্তা বলছেন।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘রাজপথে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার বিরোধী দলের নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তারা যদি মনে করে শুধু তাদের দাবিই মানতে হবে, তবে জুলাই আন্দোলনের যে মূল চেতনা ছিল তা ক্ষুণ্ন হয়। বিএনপি চায় সব সমস্যার সমাধান সংসদের ভেতর আলোচনার মাধ্যমে হোক।’

সরকার গঠনের পর থেকেই সংস্কার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। তবে এটি ব্যাপকভাবে সামনে আসে গত ২৩ জুলাই। ওই দিন ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বোর্ড, ইসি এবং করপোরেশনের উচ্চপদে চুক্তিতে বিএনপির দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিরোধী দলগুলো সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. শামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে। তাদের মতে, আগামী নির্বাচনকে নিজেদের কব্জায় রাখার জন্যই বিএনপি এই নিয়োগ দিয়েছে।

বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের অধীনে আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে যে বিশেষ কমিটি হয়েছিল, সেখানে কাজ করেছিলেন শামসুল আলম।

বিরোধী জোটের নেতাদের দাবি, ইসির উপসচিব পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর শামসুল আলম সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দেশ চালানোর কথা থাকলেও বিএনপি সরকারি পদগুলোতে ‘নজিরবিহীন’ দলীয়করণ শুরু করেছে। এটি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই আন্দোলনের আবেগের সম্পূর্ণ উল্টো।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে বিএনপির লোক শামসুল আলমকে বসানো থেকেই প্রমাণ হয় সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় না। আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে শামসুলকে সরাতে হবে। আমরা প্রভাব খাটানো কোনো নির্বাচন মানব না।’

তিনি অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানেও দলীয় লোক বসানোর কঠোর সমালোচনা করে একে পুরোপুরি বেআইনি বলে আখ্যা দেন।

এর জবাবে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংবিধানের ভেতরে থেকেই আলোচনার মাধ্যমে বিএনপি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবে। দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো আইন ভাঙেনি।

তবে শামসুল আলম ইসি’তে থেকে গেলে বিরোধী দলগুলো সত্যিই নির্বাচন বয়কট করবে কি না—সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিরোধী জোটের নেতাদের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই শামসুল আলমকে ইসি থেকে অপসারণ করতে হবে। রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘ইসিতে নিজেদের লোক বসিয়ে বিএনপি আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করতে চাইছে। আমরা এই নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল চাই।’

এদিকে, কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে জামায়াত জোট। এ ক্ষেত্রে তারা এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঘটনার উদাহরণ দেন।

সারা দেশে লংমার্চের প্রস্তুতি

সংসদে কথা বলার পাশাপাশি রাজপথেও বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট। গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, জুলাই আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের বিচার, নিত্যপণ্যের দাম কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা এবং প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে তারা মাঠে নামবে।

ওইদিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের মাধ্যমে তাদের এই কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ করবে তারা। সবশেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় বড় ধরনের মহাসমাবেশ করে এই কর্মসূচি শেষ হবে।

নিজস্ব কর্মসূচিও চালাবে এনসিপি

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সব কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি নিজেদের দলীয় রাজনৈতিক কাজও চালিয়ে যাবে এনসিপি। দলটি ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ এবং চার বিভাগের অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এনসিপি নেতা আখতার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি সংস্কারের অনেক কথা বললেও এখন তারা পুরোপুরি উল্টো পথে হাঁটছে। সংস্কারের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা জোটগত আন্দোলনে যেমন আছি, তেমনই এনসিপির নিজস্ব কর্মসূচিও আছে এবং তা চলবে।’

জামায়াত জোট ছেড়ে দিচ্ছে কি না—এমন গুঞ্জনের বিষয়ে আখতার বলেন, ‘দলের ভেতরে এনিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।’

এনসিপির আরেকজন শীর্ষ নেতা জানান, ‘বর্তমানে জামায়াত জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসার কোনো পরিকল্পনা এনসিপির নেই। বরং জোরালো যৌথ কর্মসূচির পক্ষেই সবাই সায় দিচ্ছেন।’ তার দাবি, রাজনৈতিক কারণে এনসিপি যেন এই জোট ছেড়ে চলে যায়—সরকার ভেতরে ভেতরে সেটাই চাইছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আনছে নতুন বার্তা

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যার বিচার, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দাবির পাশাপাশি দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরছে জামায়াত জোট।

জোটের নেতারা মনে করছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ভোগান্তি তৈরি করেছে। কারখানাগুলোতে গ্যাসের অভাব এবং বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের প্রচণ্ড লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের মনে যে অসন্তোষ জমেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আরও বাড়াতে চায় তারা।

যেভাবে শত্রু হয়ে উঠল সাবেক বন্ধুরা

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধ শুরু হলেও, সেটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের ফল বাস্তবায়ন নিয়ে দল দুটি দুটি ভিন্ন মেরুতে অবস্থান নেয়। সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলে জামায়াত ও এনসিপির বিজয়ী প্রার্থীরা শপথ নিলে বিএনপি তাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে মন্তব্য করে, যা নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা চারটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং অন্য ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করা নিয়েও বিতর্কে জড়ায় দুই পক্ষ। বাতিল হওয়া কিছু অধ্যাদেশকে সংশোধিত আকারে নতুন বিল হিসেবে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে বিরোধী সংসদ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠক বয়কট করেন।

এমনকি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং নানা কমিটি গঠন নিয়েও দুপক্ষের মধ্যে তুমুল হট্টগোল ও সংসদ বর্জনের ঘটনা ঘটে।

১৯৯৯ সালে জোট বেঁধে প্রায় ২৫ বছর একসঙ্গে পথ চলার পর, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি-জামায়াতের দীর্ঘদিনের সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরে। ২০২৫ সাল থেকে দুটি দল সম্পূর্ণ আলাদা পথে হাঁটা শুরু করে।

সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে, আর ৭৭টি আসন পাওয়া জামায়াত-এনসিপি জোট সংসদে প্রধান বিরোধী দলের স্থান নেয়।

সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ