গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশে ক্রয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পর রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি নামজারি বা মিউটেশনের মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে মালিকানা নথিভুক্ত করাও বাধ্যতামূলক। কারণ নামজারি ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান এমনকি খাজনা পরিশোধও সম্ভব নয়। সম্প্রতি এই প্রক্রিয়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে বাটোয়ারা না হলে আলাদা খতিয়ান হবে না; বরং একই খতিয়ানে সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। যৌথ নামজারির জন্য আলাদা বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন নেই। তবে কেউ আলাদা খতিয়ান করতে বা পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলে তাঁর নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিয়মের মাধ্যমে বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতি চালু হয়েছে। এতে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের নাম নিশ্চিত হবে এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নামজারি কী এবং কেন জরুরি
জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর কেবল রেজিস্ট্রেশন করলেই কাজ শেষ হয় না; সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ান থেকে আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করাকেই বলা হয় নামজারি।
বাংলাদেশে বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনেই নামজারির আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পর সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নামজারি না করলে মালিকানার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—রেকর্ডে নাম না থাকলে অবৈধ দখলদার বা অন্য ওয়ারিশ জমির দাবি তুলতে পারেন। নতুন আইনে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি রেজিস্ট্রি, দান বা হেবা করা যাবে না। এমনকি ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দিতে গেলেও নিজ নামে খতিয়ান লাগবে।
নতুন নিয়মে যেসব পরিবর্তন এসেছে
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের এই পরিবর্তিত নিয়ম এখন কার্যকর হয়েছে। এতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে ওয়ারিশদের ‘সবার নাম একসঙ্গে’ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অর্থাৎ আগে বাবা মারা গেলে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একজন নিজের নামে আলাদাভাবে নামজারি করে নিতে পারতেন। এখন থেকে তা আর সম্ভব হবে না। মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করতে হবে, যা ‘কো-শেয়ারার’ হিসেবে দেখানো হবে।
আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একসঙ্গে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়লে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আগে প্রায়ই দেখা যেত এক বা দুজন ওয়ারিশ বাকিদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে করে নিতেন। নতুন নিয়মে সবাইকে একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করায় সেই সুযোগ বন্ধ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন আর নামঞ্জুর করা যাবে না। “আগে অনেক ভূমি অফিস বণ্টননামা না থাকলে যৌথ নামজারিও নামঞ্জুর করত। এখন মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে শুধু এই কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
নতুন নিয়মে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হবে।
আলাদা খতিয়ান পেতে যা লাগবে
পৈতৃক বা যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে অংশীদারেরা নিজেদের মধ্যে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে অংশ বুঝে নিয়ে সরকারিভাবে নিবন্ধন করালে সেই লিখিত চুক্তিপত্রকে বলা হয় রেজিস্টার্ড বণ্টননামা। ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি বাটোয়ারা করে নিলে তবেই আলাদা খতিয়ান করা যাবে—শর্ত হলো নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
অর্থাৎ এখন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির দুটি পথ:
- যৌথ নামজারি: সবাই মিলে এক খতিয়ানে নাম উঠবে, প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশও উল্লেখ থাকবে।
- পৃথক নামজার*: নিবন্ধিত বণ্টননামা অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজ নামে আলাদা খতিয়ান পাবেন।
নামজারি ছাড়া রেজিস্ট্রেশন হবে না
আগে অনেক সময় নামজারি ছাড়াই জমি কেনাবেচা হতো। নতুন আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে, নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করা যাবে না। ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের সময় নামজারির খতিয়ান দেখানো বাধ্যতামূলক হয়েছে।
যাঁদের নামজারি আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং খতিয়ান সঠিক আছে, তাঁদের নতুন করে নামজারি করতে হবে না। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাইজড হয়েছে কি না তা অনলাইনে যাচাই করে নেওয়া ভালো—নইলে ভবিষ্যতে খাজনা পরিশোধ বা বিক্রিতে সমস্যা হতে পারে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সময়সীমা
আবেদন জমা হওয়ার ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করতে চায় ভূমি মন্ত্রণালয়। আবেদনের জন্য প্রয়োজন হবে—
– দলিলের কপি বা রেজিস্ট্রি দলিল
– আগের খতিয়ানের কপি ও দাগ নম্বর
– জাতীয় পরিচয়পত্র
– উত্তরাধিকার সূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ
– নির্ধারিত ফির রসিদ
কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে বা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লাগতে পারে।
নতুন নিয়মের সুফল ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা এই নিয়মের তিনটি বড় সুফল দেখছেন। প্রথমত, ওয়ারিশদের মধ্যে প্রতারণা কমবে—কেউ একা সব জমি নিজের নামে করে নিতে পারবেন না।
দ্বিতীয়ত, সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ থাকবে, ফলে প্রকৃত মালিক সহজে শনাক্ত করা যাবে।
তৃতীয়ত, যৌথ নাম থাকায় সবাই খতিয়ানে স্বীকৃতি পাওয়ায় ভূমি সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা কমবে।
আইনজীবী ইশরাত হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এই পরিবর্তনের ফলে নামজারি সহজ ও দ্রুত হবে এবং বণ্টননামা করার ক্ষেত্রে হয়রানি কমবে। “বণ্টননামা না থাকার অজুহাতে যৌথ নামজারি প্রত্যাখ্যান এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড হালনাগাদ সহজ করতেই এই নির্দেশনা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
তবে বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক পরিবারে কেউ প্রবাসে থাকেন বা কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই, ফলে সবার কাগজপত্র একসঙ্গে জমা দেওয়া কঠিন হতে পারে এবং ওয়ারিশ খুঁজে বের করাও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আলাদা খতিয়ান করতে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হওয়ায় বাড়তি খরচ ও সময় লাগবে। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করতে তহশিল ও এসি ল্যান্ড অফিসে জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন হবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হবে
ভূমি আইনজীবীদের মতে, নতুন নিয়মটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য ভালো উদ্যোগ, বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় এটি সহায়ক হবে। কারণ আগে অনেক সময় শরিকদের মধ্যে কাউকে বাদ দিয়ে নামজারি করার অভিযোগ উঠেছে একাধিক ক্ষেত্রে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আমাদের দেশে অনেক সময় মেয়েদের বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার একটা প্রবণতা দেখা যায়, ওইসব ঝামেলা থেকে মামলার সংখ্যাও বেড়ে যায়।” নতুন নিয়মে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কাউকে বঞ্চিত করার সুযোগ কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বণ্টননামা করা হলে সেটিকে আলাদা খতিয়ানে রূপান্তর করা যাবে, তবে প্রাথমিকভাবে সবার নামে একটি যৌথ মিউটেশনই হবে। এই ব্যবস্থার ফলে দেশে জমে থাকা ভূমি সংক্রান্ত অসংখ্য মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।
“আগে জয়েন্ট মিউটেশনের বিষয়টি না থাকায় অনেক সময় দেখা যেত, ভাইবোনের একজন অন্যজনকে না জানিয়ে সব সম্পত্তি নিজের নামে করে ফেলছেন। এখন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে,” বলেন ফাহমিদা আখতার।
যা পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
নিয়মটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষয়টি সাধারণ মানুষকে জানাতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্যাম্প করে মানুষকে বিষয়টি বোঝানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা—নইলে অজ্ঞতার কারণে অনেকের জমি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ফাহমিদা আখতার বলেন, “এই নিয়ম কেবল বইয়ে থাকলেই হবে না, এর যথাযথ প্রয়োগ না থাকলে এই আইন না থাকার শামিল।”
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, জমি কেনার পর দলিল রেজিস্ট্রির ৯০ দিনের মধ্যেই নামজারির আবেদন করা উচিত। ওয়ারিশি জমি হলে পরিবারের সবাই মিলে বসে প্রথমে যৌথ নামজারি করা ভালো; পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে বণ্টননামা করে আলাদা হওয়ার সুযোগ থেকেই যায়।
সূত্র: বিবিসি