রয়টার্স
ইরানের হামলার শিকার হতে পারেন—এ আশঙ্কা থেকে নিজেদের মুঠোফোন ও কম্পিউটারে ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ (মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি) নিষ্ক্রিয় করে রাখছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। মার্কিন সিনেটর রন ওয়াইডেনের লেখা একটি চিঠিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। গত শুক্রবার এ চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে।
কয়েকজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একই কথা জানিয়ে বলেন, তাঁদের বিভিন্ন ধরনের ফোন ও কম্পিউটারে থাকা ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া ‘লোকেশন ডেটা’ ব্যবহার করে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে—এমন খবর নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তার মধ্যেই মার্কিন বাহিনীর এ পদক্ষেপ গ্রহণের খবর প্রকাশ্যে এল।
‘অ্যাড ট্র্যাকার’ বলতে এমন একটি প্রযুক্তিকে বোঝায়, যা মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারকারীর অবস্থান, ব্রাউজিং তথ্য, অ্যাপ ব্যবহার বা অনলাইন কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহ ও অনুসরণ করতে পারে। সাধারণত এসব তথ্য মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে তাঁর লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন দেখাতে ব্যবহার করা হয়।
মার্কিন বিমানবাহিনী ওয়াইডেনকে জানিয়েছে, দুই মাস আগে তারা তাদের কম্পিউটার ও মুঠোফোনে থাকা ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ নিষ্ক্রিয় করেছে।
অন্য এক চিঠিতে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড জানিয়েছে, তারা সম্প্রতি তাদের উইন্ডোজচালিত ডিভাইসগুলোয় থাকা এসব শনাক্তকারী ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করেছে।
আর মার্কিন সেনাবাহিনী রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই তাদের মুঠোফোনের ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে।
ওরেগন অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট–দলীয় সিনেটর ওয়াইডেন কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাবদিহি ও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন।
মুঠোফোন ও কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের অবস্থান সম্পর্কে বিজ্ঞাপনশিল্পের তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলো ডেটা ব্রোকারদের কাছে বিক্রি ক্রমবর্ধমান জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে এনেছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন সামরিক সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত ও তাঁদের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
ডেটা ব্রোকার হলো এমন প্রতিষ্ঠান, যারা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংকলন এবং পরে তা অন্যদের কাছে বিক্রি করে।
মার্কিন বিমানবাহিনী ও স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ওয়াইডেনকে দেওয়া সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর ডিভাইসগুলোয় বিজ্ঞাপন আইডি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তবে ঠিক কবে থেকে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে, সে বিষয়ে চিঠিতে তথ্য দেওয়া হয়নি।
সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উইন্ডোজ কম্পিউটারগুলোয় বিজ্ঞাপন আইডি ২০২১ সালের আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। তবে অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের মুঠোফোনে অন্তত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
নৌবাহিনীর বক্তব্য জানতে পাঠানো বার্তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
স্মার্টফোন থেকে ব্যবহারকারীর অবস্থান সম্পর্কে যে তথ্য বা লোকেশন ডেটা পাওয়া যায়, তার পরিমাণ কমানোর এ উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হলো, যখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা সামগ্রিকভাবে ফোন ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয় বিবেচনা করছেন।
গত জুলাইয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মধ্যে কাউকে কাউকে তাঁদের ফোন জমা দিতে বলা হতে পারে। কারণ, ইন্টারনেটে তাঁদের পোস্ট করা ভিডিওগুলো ব্যবহার করে ইরান ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করতে পারছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াইডেন ও নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি প্যাট হ্যারিগান এ নিয়ে গত শুক্রবার পেন্টাগনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা চিঠিতে সামরিক বাহিনী এবং এর সদস্যদের অবস্থানের তথ্য কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন।
চিঠিতে বিভিন্ন সামরিক শাখার দেওয়া তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব তথ্যে সামরিক বাহিনীর মুঠোফোন ও কম্পিউটারে ‘অ্যাড আইডি’ নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে তাদের নেওয়া পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে।]
ওয়াইডেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, সামরিক বাহিনীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো যে ‘এ হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর হয়নি, তা এখন স্পষ্ট’।
হ্যারিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের ক্রেডিট কার্ড বের করে এমন তথ্য কিনতে দেওয়া উচিত নয়, যা তাদের মার্কিন সেনাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে সহায়তা করে।
পেন্টাগন এক ই-মেইলে জানিয়েছে, আইনপ্রণেতাদের দেওয়া চিঠির জবাব তারা সরাসরি তাঁদের কাছেই দেবে।
মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি (এমএআইডি) হলো প্রতিটি ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত আলাদা আলাদা শনাক্তকারী ব্যবস্থা। এগুলো ব্যবহার করে মুঠোফোনের বিভিন্ন অ্যাপে ব্যবহারকারী ব্যক্তির কার্যকলাপ অনুসরণ করা এবং তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব।
মুঠোফোন ও কম্পিউটারের মতো ডিভাইস ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষায় কাজ করা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ডিক্রিপ্টঅ্যাডসের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক এডওয়ার্ডস বলেন, সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোয় মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি নিষ্ক্রিয় করার উদ্যোগ ‘নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ’।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এসব বিধিনিষেধের ফলে বিভিন্ন কোম্পানি যে বিপুল পরিমাণ ডেটা বিক্রি করে, সেখানে সামরিক সদস্যদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বন্ধ হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আরও জটিল কিছু উপায়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব। যেমন ডিভাইসের কারিগরি তথ্যের সঙ্গে নেটওয়ার্ক ডেটা বা লোকেশন তথ্য মিলিয়ে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন নেতৃত্বের প্রত্যাশা ছিল ইরানের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক–সামরিক চাপ তেহরানের নেতৃত্বকাঠামোয় পরিবর্তন ঘটাবে।
কিন্তু ছয় মাস পর এখন স্পষ্ট, সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং এর প্রভাব সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে।