জালিয়াতির অভিযোগ: ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

এর আগে তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে গত ২০ অগাস্ট স্বাধীন তদন্ত চেয়েছিলেন পুতুল।

জালিয়াতির অভিযোগ: ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক প্রধানের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে খবর দিয়েছে রয়টার্স।

ডব্লিউএইচও এবং বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালিয়াতির তদন্তের মুখে তিনি বুধবার সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বলে রাতে রয়টার্সের এ প্রতিবেদনে বলা হয়।

রয়টার্সের হাতে আসা তার পদত্যাগপত্রের বরাত দিয়ে এ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বুধবার পদত্যাগের ঘোষণা দেন সায়মা ওয়াজেদ, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

এর আগে গত তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে গত ২০ অগাস্ট স্বাধীন তদন্ত চেয়েছিলেন পুতুল।

সূত্রের বরাতে রয়টার্স বলছে, ডব্লিউএইচও আগামি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুতুল ও ডব্লিউএইচওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

রয়টার্স লিখেছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর এর যে প্রভাব পড়েছে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগের ঘটনাকে এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনার অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্র এখন দুর্নীতির মামলার আসামি, অথবা তার মতোই স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তার মেয়ে পুতুল ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাঁচ বছরের জন্য ওই দায়িত্ব নেন।

ওই বছর অগাস্টের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার মা শেখ হাসিনা। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেখ হাসিনার পাশাপাশি পুতুলকেও কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় আসামি করা হয়।

এর চার মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ জুলাই পুতুলকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। সে সময় একজনকে ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে তার মেয়াদ শেষ হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে প্লট দুর্নীতির অভিযোগে এক মামলায় পুতুলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। এর আগে তাকে ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারিরও আদেশ দিয়েছিল ঢাকার আদালত।

ডব্লিউএইচওর অভিযোগ ও সায়মার জবাব

২০২৬ সালের ৩ জুলাই পুতুলের আইনজীবীদের দেওয়া একটি চিঠির তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচও তার বিরুদ্ধে ‘চীন সফরে আর্থিক জালিয়াতি’ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। তবে এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন তিনি।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালককে দেওয়া পদত্যাগপত্রে পুতুল লেখেন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অবৈধভাবে জমি দখলেরও অভিযোগ আনা হয়েছে। এর জবাবে তিনি বলেন, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি অর্জন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি আইনের অধীনে ওই জমির বৈধ অধিকারী ছিলেন তিনি।

চীন সফরের আর্থিক জালিয়াতির বিষয়ে তার আইনজীবীরা বলেন, রুটিন বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি ছিল একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুল; যার অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৯০১ ডলার। আর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের জন্য তিনি সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছেন, যা সংস্থার মহাপরিচালক আগে থেকেই জানতেন।

‘আস্থা হারিয়েছেন’ সায়মা

বুধবার রাতে ডব্লিউএইচওর ডিজির কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে পুতুল লেখেন, “আমি আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম, যা আমি নিষ্ঠার সঙ্গে করেছি।

“যেহেতু আপনি আমাকে আমার দায়িত্ব পালনে ক্রমাগত বাধা দিয়ে আসছেন, তাই ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বে আপনার ওপর আমি সব বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়েছি। এছাড়া, আমাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় এক বছর ধরে বেতন না পাওয়ায় আমার আর্থিক অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”

এর আগে গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, গোপনীয়তার স্বার্থে পুতুল ছুটিতে আছেন।

জানুয়ারিতে নতুন নির্বাচন

দুই কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স লিখেছে, জাতিসংঘের সংস্থাটি পুতুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

নাম প্রকাশ না করে তারা বলেন, আগামী ১২ অক্টোবর নতুন মনোনয়নের ঘোষণা দেওয়া হবে। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন করা হতে পারে।

ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকরা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হন। বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে পাঁচ বছরের জন্য এ পদে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়।

২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচনে ১০ ভোটের মধ্যে ভারতের ভোটসহ আটটি ভোট পেয়েছিলেন পুতুল।