গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
চট্টগ্রামের খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে আটতলা ভবন থেকে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৬৩ জন বিদেশি নাগরিকের কাছে কোনো পাসপোর্ট পায়নি পুলিশ।
থানা পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রতারণার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তারের কথা বললেও প্রতারণার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেনি।
গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে লাওসের ৩৪ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, নেপালের একজন, ভিয়েতনামের একজন ও চীনের ৫ জন রয়েছেন। এছাড়া, তাদের সঙ্গে একটি শিশুও ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ২০ নারী।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। তবে কারো কাছে কোনো পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি। তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি কম্বোডিয়ার চাকরির কার্ড পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন, ‘পুরো ভবনটি ভাড়া নিয়ে তারা সেখানে অনলাইনে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কাজ করে আসছে। তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি কিছু চক্র আছে।’
‘লাওস ও কম্বোডিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। তাই সেখান থেকে অনেকেই কৌশলে বাংলাদেশে চলে এসেছেন,’ বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘প্রতারণার ধরন আমরা তদন্ত করছি। আপাতত তাদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে।’

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পাসপোর্ট না পাওয়ায় তারা কোন ভিসায় দেশে এসেছে তার বিস্তারিত জানতে পারেনি পুলিশ। আবার অনেকে ইংরেজি ভাষা বলতে ও বুঝতে না পারায় দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদ করেও তাদের কাছ থেকে কিছু জানা যায়নি।
পুলিশ জানায়, মাস ছয়েক আগে পুরো ভবনটি ভাড়া দেওয়া হয়। ভবনটির মালিক দুবাইপ্রবাসী। মাসে প্রায় ৪-৫ লাখ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। ভবনটিতে দেশ অনুযায়ী ভাগ ভাগ করে বিদেশি নাগরিকরা থাকতেন।
ভবনে চীনা ও কম্বোডিয়ার নাগরিকদের বাবুর্চি আরমান হোসেন বলেন, ‘এক চীনা নাগরিকের মাধ্যমে আমি ওখানে মাসিক ৪০ হাজার টাকা চুক্তিতে বাবুর্চির কাজ করি। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জনের জন্য রান্না করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার আরেক সহযোগী জুয়েল রানা পাকিস্তানি ও নেপালের নাগরিকদের জন্য রান্না করতো।’
‘মহসিনের খোঁজে পুলিশ, কাজের নাম দিয়ে আনা হয় বিদেশিদের’
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মহসিন নামে একজনের কাছে গ্রেপ্তার বিদেশিদের পাসপোর্ট জমা আছে। তিনিই ভবনটি ভাড়া নিয়ে ওই বিদেশিদের যাবতীয় কিছুর দেখভাল করতেন।
কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা এখানে এসেছেন, তারা অনেকেই অনলাইন মার্কেটিংয়ে কাজ পারেন। মূলত এই সিন্ডিকেটটি অনলাইন মার্কেটিংয়ে পণ্য দেওয়ার নাম করে অগ্রিম টাকা নেওয়া কিংবা হানিট্র্যাপের মতো কাজ জানেন। আমাদের ধারণা, তাদের মধ্যে এক্সপার্ট আছেন, যারা অনলাইন মার্কেটিং ও স্ক্যাম করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদেরকে চাকরির প্রলোভন দিয়ে এখানে আনা হয়েছে। মহসিন নামে একজন এর পেছনে আছে। বিদেশি নাগরিকদের কাছে পাসপোর্ট না থাকার মানে হচ্ছে, তারা যাতে হুট করে অন্য কোথাও কিছু করতে না পারেন কিংবা নিজের ইচ্ছামতো দেশে ফেরত যেতে না পারেন, সেজন্যই হয়তো পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
‘তাদের নিজস্ব দোভাষী আছেন। এই বিদেশিদের মাসিক বেতন হিসাব করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা মাত্র এসেছে। সেটআপ রেডি হচ্ছিলো।’
এ বিষয়ে খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমরা মহসিন নামে একজনের কথা জেনেছি। তার কাছে অধিকাংশ পাসপোর্ট আছে। এছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা কবে, কোন ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন, সেটা বের করা হবে।’
কাউন্টার টেরোরিজমের কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশের করা জব্দ তালিকা বেশ এলোমেলো। সেখানে কার কাছ থেকে কী কী ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে, তার বিবরণ নেই। শুধু মাত্র ডিভাইসের বর্ণনা রয়েছে। এটি মামলার তদন্তে প্রভাব ফেলবে।
কাউন্টার টেরোরিজমের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শামীম হোসাইন বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে পাওয়া ডিভাইসগুলো ফরেনসিক করবো। তখন আরও অনেক কিছু বের হয়ে আসবে।’
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার