মো. আবু হাসান
বাজারে গেলে ডিমের ঝুড়িতে সাধারণত দুই রঙের ডিম চোখে পড়ে। কোনোটির খোসা সাদা, কোনোটির বাদামি। ক্রেতাদের অনেকেরই বিশ্বাস, বাদামি ডিম বেশি স্বাস্থ্যকর, বেশি “প্রাকৃতিক” কিংবা বেশি সুস্বাদু। সেই বিশ্বাসের দামও ক্রেতাকে দিতে হয়, কারণ বাদামি ডিমের দাম সাধারণত বেশি। কিন্তু বিজ্ঞান এ বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ায় না।
বাদামি ও সাদা ডিমের পুষ্টিগুণ মূলত একই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) স্পষ্ট করেই বলেছে, বাদামি ডিম সাদা ডিমের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর নয়। কোনো এক রঙের ডিম অন্য রঙের চেয়ে বেশি সুস্বাদু, এমন জোরালো প্রমাণও নেই।
তাহলে রঙের এই পার্থক্য আসে কোথা থেকে? ডিমের খোসার রং মূলত নির্ভর করে মুরগির জাতের ওপর। সাধারণভাবে সাদা পালক ও সাদা কানের লতিযুক্ত জাতের মুরগি সাদা ডিম দেয়, আর লালচে-বাদামি পালকের জাতগুলো দেয় বাদামি ডিম। বাদামি রং আসে খোসার ওপর জমা হওয়া একটি রঞ্জক পদার্থ থেকে, যা ডিম তৈরির শেষ পর্যায়ে খোসার বাইরের স্তরে যুক্ত হয়। সাদা ডিমে এই রঞ্জক থাকে না। তবে ভেতরের অংশ, অর্থাৎ সাদা অংশ ও কুসুম, দুই ক্ষেত্রেই একই রকম। জাত ছাড়াও মুরগির বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, পালনের পরিবেশ, অসুস্থতা ও মানসিক চাপ খোসা কতটা গাঢ় বা হালকা হবে, তা কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি একই মুরগির ডিমের রংও সময়ের সঙ্গে সামান্য বদলাতে পারে। অর্থাৎ এই রং ডিমের ভেতরের গুণমানের কোনো নির্দেশক নয়।
ডিমের পুষ্টিমান আসলে নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, মুরগির খাদ্য। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানো মুরগি ওই সব পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ ডিম দিতে পারে। কুসুমের রংও অনেকটা খাবারের ওপর নির্ভরশীল। ভুট্টা বা ক্যারোটিনযুক্ত উপাদান বেশি খেলে কুসুম গাঢ় হলুদ বা কমলাটে হয়। তবে গাঢ় কুসুম মানেই বেশি পুষ্টি, এই ধারণা সব সময় ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত, পালনের পদ্ধতি। খোলা জায়গায় চরে বেড়ানো মুরগির ডিমে ভিটামিন ডি বেশি থাকতে পারে, কারণ রোদের সংস্পর্শে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তৃতীয়ত, ডিমের আকার। বড় ডিমে স্বাভাবিকভাবেই বেশি পুষ্টি উপাদান থাকে, কারণ এতে খাবারের পরিমাণ বেশি।
বাদামি ডিমের বাড়তি দামের ব্যাখ্যাও এখানেই। মেডিকেল নিউজ টুডে-র তথ্য অনুযায়ী, বাদামি ডিম পাড়া মুরগিগুলো সাধারণত আকারে বড় হয় এবং এদের খাবারও বেশি লাগে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় দামও বেশি হয়। অর্থাৎ বাড়তি দামের কারণ খরচ, বাড়তি পুষ্টি নয়।
রং যা-ই হোক, ডিম একটি সুষম খাদ্য উপাদান। একটি বড় আকারের ডিমে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ক্যালরি থাকে। এতে আছে উচ্চমানের প্রোটিন, কোলিন (যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর কাজে গুরুত্বপূর্ণ), ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, সেলেনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ। পরিমাণে সামান্য তারতম্য হতে পারে, তবে সেটা খোসার রঙের কারণে নয়। ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল আছে। সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত ডিম সাধারণত সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে যাঁদের ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা আছে, তাঁরা কয়টি ডিম খাবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশে দেশি মুরগির ডিম নিয়েও একটি জনপ্রিয় ধারণা আছে যে সেগুলো ফার্মের ডিমের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর। দেশি মুরগির ডিম সাধারণত আকারে ছোট হয়। এর স্বাদ বা পুষ্টি নিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু খোসার রং দেখে পুষ্টিমান বিচার করা যায় না। কারণ জাত, খাদ্য ও পালনের পদ্ধতি অনুযায়ী একই রঙের ডিমের মধ্যেও পার্থক্য হতে পারে।
খোসার রঙের চেয়ে ডিমের তাজা ভাব ও মান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেনার সময় খোসা পরীক্ষা করা উচিত। ডিমের খোসা পরিষ্কার ও অক্ষত হওয়া চাই। ফাটা ডিম এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এতে জীবাণু ঢোকার ঝুঁকি থাকে। সম্ভব হলে ঠান্ডা অবস্থায় রাখা ডিম কেনা এবং বাড়িতে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা ভালো। প্রয়োজন ও রান্নার ধরন অনুযায়ী আকার ঠিক করাও জরুরি। অর্গানিক, খাঁচামুক্ত (কেজ-ফ্রি), ফ্রি-রেঞ্জ, ভিটামিনসমৃদ্ধ ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ইত্যাদি লেবেল উৎপাদন পদ্ধতি ও সম্ভাব্য পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও ভুললে চলবে না। কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ ডিমে সালমোনেলা জীবাণুর ঝুঁকি থাকতে পারে। শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধক্ষমতার মানুষের জন্য ডিম ভালোভাবে সেদ্ধ বা ভাজা করে খাওয়াই নিরাপদ। বাসায় এনে ডিম ভালোভাবে ধুয়ে সংরক্ষণ করা উচিত। ডিম ধরার পর হাত ধুয়ে নেওয়া এবং কাঁচা ডিমের সংস্পর্শে আসা বাসনপত্র পরিষ্কার করাও জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ডিম কোনটি কিনব, বাদামি না সাদা, এই প্রশ্নের উত্তর আসলে স্বাস্থ্যের নয়, মুরগির জাত ও খরচের। খোসার রঙের সঙ্গে ডিমের পুষ্টিগুণ বা স্বাস্থ্য উপকারিতার সম্পর্ক সামান্যই। মুরগির খাদ্য, ডিমের আকার ও উৎপাদন পদ্ধতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরের বার ডিম কেনার সময় রঙের বদলে তাজা ভাব, মান ও লেবেলের তথ্যের দিকে নজর দিন। আপনার বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো রঙের ডিমই সুষম খাদ্যতালিকায় ভালো জায়গা করে নিতে পারে।
মো. আবু হাসান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)
সূত্র: www.msn.com