কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা, ট্রাম্পের শেষ দুই বছর কঠিন হতে পারে

সেনেটে রিপাবলিকানদের সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি। তদন্ত, নিয়োগ ও বাজেটে চাপে পড়বে হোয়াইট হাউস

কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা, ট্রাম্পের শেষ দুই বছর কঠিন হতে পারে

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে হটিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর তাঁর প্রথম দুই বছরের চেয়ে অনেক ভিন্ন হতে পারে।

নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে ছিল ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের তিনটি আসন বাড়াতে হতো। বুধবার ভোরে সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, দলটি সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। সেনেটে সিএনএনের প্রক্ষেপণে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ৫১ আসনে জিতেছে। এতে উচ্চকক্ষে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে। ওহাইও, আয়োয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, কানসাস ও টেক্সাসে রিপাবলিকানদের আসন তারা দখল করেছে।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা হাকিম জেফরিসের স্পিকার হওয়ার পথ এখন প্রায় পরিষ্কার। তিনি বর্তমানে সংখ্যালঘু দলের নেতা।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া রিপাবলিকানদের পক্ষে কোনো আইন পাস করা কঠিন হবে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু, নথি ও সাক্ষ্য তলব এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতাও তাদের হাতে আসছে।

সেনেটের হিসাব আরও জটিল। মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারপতি নিয়োগে এই কক্ষের অনুমোদন লাগে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির ক্ষেত্রেও একই বিধান। ফলে ট্রাম্পের অনেক নিয়োগ আটকে যেতে বা বিলম্বিত হতে পারে। আইন প্রণয়নেও হোয়াইট হাউসকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে রাজনৈতিক প্রতিবেদক জোসেফ গেডিয়ন লিখেছেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা বেশ কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে পারেন।

প্রথম লক্ষ্য ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা। প্রতিনিধি পরিষদের তদারক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রবার্ট গার্সিয়া পরিবারটির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে তদন্তের শীর্ষে রেখেছেন। কংগ্রেস সদস্য জেমি রাসকিন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসার তথ্য চেয়েছেন।

দ্বিতীয় বিষয়, যৌন অপরাধে দণ্ডিত প্রয়াত ধনকুবের জেফরি এপস্টিনসংক্রান্ত নথি। ডেমোক্র্যাট রো খান্না ও রিপাবলিকান টমাস ম্যাসির যৌথ উদ্যোগে গত বছর এসব নথি প্রকাশে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। তবে বিভাগটি আইনে নির্ধারিত সময়সীমা মানেনি। তাদের হেফাজতে থাকা ৬০ লাখ পৃষ্ঠার মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা। বাকিগুলোকে বিচার বিভাগ একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি বলে দাবি করছে। প্রকাশিত নথির কিছু অংশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য গোপন করা হয়েছে। কোথাও আবার অসাবধানতায় ভুক্তভোগীদের নাম প্রকাশ পেয়েছে। এ নিয়ে দুই দলের সদস্যরাই উদ্বেগ জানিয়েছেন। সাংবাদিক কেটি ফ্যাং বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন।

বর্তমান কংগ্রেসেও এ বিষয়ে দুই দল একসঙ্গে কাজ করেছে। তদারক কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কমারের নেতৃত্বে সাক্ষীদের তলব করা হয়েছে। সাড়া না দিলে কংগ্রেস অবমাননার অভিযোগ আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গার্ডিয়ানের মতে, ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ নিলেও এই দ্বিদলীয় উদ্যোগ অব্যাহত থাকতে পারে।

তৃতীয় বিষয় পেন্টাগন। কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তরে তদন্ত শুরু করতে চান। তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা কমিটির সদস্য এবং দুর্নীতিবিরোধী ককাসের সহসভাপতি। তাঁর উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ ট্রাম্প পরিবারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে সরানো হয়েছে।

তৃতীয়বারের মতো ট্রাম্পের অভিশংসনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি জেফরিস। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে দলটি কোনো সম্ভাবনাই নাকচ করছে না। রিপাবলিকান নেতা স্টিভ স্ক্যালিস বলেছেন, নতুন কংগ্রেসের প্রথম দিন থেকেই ডেমোক্র্যাটরা অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর কংগ্রেসের কমিটিগুলো একের পর এক তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যে ছিল ট্রাম্পের ব্যবসা, রাশিয়া-সংক্রান্ত তদন্ত সামলানোর পদ্ধতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ। ২০১৯ সালে পরিষদ তাঁকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ ছিল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক তথ্য জোগাড়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর চাপ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে কংগ্রেসের তদন্তে বাধা দিয়েছিলেন। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণাধীন সেনেটে দুই অভিযোগ থেকেই খালাস পান তিনি। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলায় উসকানির অভিযোগে দ্বিতীয়বার অভিশংসিত হন, সেবারও সেনেটে খালাস পান।

২০১৮ ও এবারের পরিস্থিতির মধ্যে মূল পার্থক্য সেনেট। তখন উচ্চকক্ষ রিপাবলিকানদের হাতে থাকায় ট্রাম্পের নিয়োগ ও আইন কার্যত নিরাপদ ছিল, অভিশংসনও সেখানে আটকে যায়। এবার সেই সুরক্ষা নেই।

তবে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতারও সীমা আছে। অভিশংসিত প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করতে সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগে। ট্রাম্পের ভেটো বাতিল করতেও দুই কক্ষে একই হারে সমর্থন দরকার। ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখন সেই সংখ্যা নেই। তাই বাস্তবে তাদের প্রধান হাতিয়ার হবে তদন্ত, নিয়োগে বাধা ও বাজেট নিয়ে দর-কষাকষি। অভিশংসন হলেও অপসারণের সম্ভাবনা কম।