যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হলেন আবদুল আল-সাঈদ

ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রকাশ্য সমালোচক হিসেবে পরিচিত আল-সাঈদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হলেন আবদুল আল-সাঈদ

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আবদুল আল-সাঈদ। দেশটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলিম, যিনি সিনেটে জায়গা করে নিলেন।

মিসরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাঈদের বয়স ৪২ বছর। তিনি সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার নেতা হিসেবে পরিচিত। অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের খালি হওয়া আসনে তিনি জয়ী হয়েছেন।

আল-সাঈদ ২০২৬ সালে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরেন। আগস্টে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাথমিকে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন।

তাঁর প্রচারণায় সমর্থন দিয়েছেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং মিশিগানের প্রতিনিধি রাশিদা তালিব।

প্রচারণায় আল-সাঈদ ‘মেডিকেয়ার ফর অল’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য করা, আবাসন ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব কমানো এবং শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন।

ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রকাশ্য সমালোচক হিসেবে পরিচিত আল-সাঈদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এই অবস্থান প্রচারণার সময় বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। সাধারণ নির্বাচনের দুই দিন আগে প্রাথমিকে পরাজিত হ্যালি স্টিভেন্স দলীয় সীমারেখা পেরিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দেন। সমর্থনের কারণ হিসেবে তিনি আল-সাঈদের প্রচারণার বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংযোগ নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেন।

স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাটদের অনেকে ক্ষুব্ধ হন। তবে শেষ পর্যন্ত এতে আল-সাঈদের জয় আটকায়নি।

নির্বাচনী প্রচারণায় আল-সাঈদের মুসলিম পরিচয়ও আলোচনায় আসে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্য রিপাবলিকান নেতারা তাঁর ধর্ম ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বারবার সমালোচনা করেছেন।

আল-সাঈদ এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকদের বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে প্রেসিডেন্ট তাঁর নাম ও ধর্মকে ব্যবহার করছেন।

আল-সাঈদের জন্ম ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, মিশিগানের রোচেস্টার হিলসে। এটি ডেট্রয়েটের উত্তরের একটি শহরতলি। তাঁর বাবা-মা মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসেন। আরবি ছিল তাঁর প্রথম ভাষা।

উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি কুস্তি ও ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। পরে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েন। এরপর রোডস স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। স্ত্রী সারা ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি অ্যান আর্বারে বাস করেন।

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি মিশিগানের সবচেয়ে বড় শহর ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন। আর্থিক সংকটের পর শহরের জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগে তিনি নেতৃত্ব দেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।

২০১৮ সালে তিনি মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিকে লড়েন, কিন্তু গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান। পরে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও ভেটেরান্স সেবা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। এই বিভাগের আওতায় ডেট্রয়েট শহরও পড়ে।

সিনেটে আল-সাঈদ প্রথম মুসলিম হলেও কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে এর আগে মুসলিম আমেরিকানরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হন। ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হন।