গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
পোশাক শ্রমিকদের টানা কয়েক দিনের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের পর প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের খসড়া পর্যালোচনাসংক্রান্ত আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করে। বাহিনীর অনেক সদস্য হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তারা যথাসম্ভব সংযম দেখিয়েছেন। শ্রমিকদের ওপর বল প্রয়োগ থেকে বিরত থেকেছেন।
গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনে নামে শ্রমিকদের একটি অংশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এতে ইন্ধন আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েক দিনের বিক্ষোভে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে পোশাক খাত।
এ অবস্থায় ২ নভেম্বর সচিবালয়ে পোশাক শিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও কথা বলে সরকার। এর আগে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।
বুধবারের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের প্রধান দাবি ছিল নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়ন পেতে কিছুটা সময় লাগায় বোর্ড গঠনে বিলম্ব হয়েছিল। নাম পাওয়ার পরদিনই বোর্ড গঠন করা হয় এবং বুধবার এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি জানান, বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের প্রতিনিধি রয়েছেন। অতীতে মজুরি বৃদ্ধির হার, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মালিকপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বোর্ড। নির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি ঘোষণা করার জন্যও বোর্ডকে বলা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মজুরি নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো। এ জন্য শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখা জরুরি।
চলমান সহিংসতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকে শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক এজেন্ডা নাকি সহিংসতা—কোনটি হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, শ্রমিক আন্দোলনের নামে কিছু বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তি হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন—এমন কয়েকজন শিল্পমালিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও সামনে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, সরকার ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। যেকোনো ন্যায্য দাবির বিষয়ে কথা বলতে সরকার প্রস্তুত। তবে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।
শ্রমিকদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং কাজ শুরু করেছে। তাই এখন আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। সাধারণ শ্রমিকদের গুজব ও উসকানিতে কান না দিয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শ্রমিকরা কাজে ফিরলে উৎপাদন সচল থাকবে, তাদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে।