পৌর নির্বাচন: অর্থ-সম্পদ নেই, তবু ‘তথ্য গোপন’ রিপনের: শান্তা, জামান ও নাইম ব্যবসায়ী
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কালীগঞ্জ বাজারের একাংশ এবং গোটা বালীগাঁও গ্রাম নিয়ে গঠিত পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড। আসন্ন পৌর নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বর্তমান কাউন্সিলরসহ চার প্রার্থী লড়ছেন।
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি কালীগঞ্জ পৌরসভায় দ্বিতীয়বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
৫ নং ওয়ার্ডে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর আশরাফুল আলম রিপন (পাঞ্জাবি), গোটা পৌরসভায় প্রথম বারের মতো নারী সদস্য হিসেবে সাধারণ কাউন্সিলর পদে অংশ নেয়া পিয়ারা বেগম শান্তা (উট পাখি), আক্তারুজ্জামান (পানির বোতল) এবং আশরাফুল হক নাইমের (ডালিম)।
এই চার প্রার্থীই রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে হলফনামায় নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সম্পদের হিসেব দিয়েছেন।
প্রার্থীদের মধ্যে বর্তমান কাউন্সিলর আশরাফুল আলম রিপন পৌরসভা থেকে “সম্মানীভাতা” বাবদ বছরে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করলেও হলফনামায় এই ‘তথ্য গোপন’ করেছেন। এছাড়াও তার নিজের এবং পরিবারের অন্য কোন সদস্যের নগদ অর্থ বা কোন সম্পদ নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন!
রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিলকৃত হলফনামার তথ্যমতে, কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর আশরাফুল আলম রিপন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিএ (মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) পর্যন্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তার নামে কোন মামলা নেই। পেশা কৃষিকাজ বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন।
কৃষিখাত থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে পৌরসভা থেকে “সম্মানীভাতা” বাবদ বছরে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করলেও এই ‘তথ্য গোপন’ করেছেন তিনি!
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে এই প্রার্থীর এবং তার পরিবারের অন্য কোন সদস্যের নগদ ও ব্যাংকে কোন টাকা জমা নেই। নিজের ও তার স্ত্রীর কোন স্বর্ণালঙ্কারও নেই।
এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ফ্রিজ ও সিডি। তার নিজের কোন মোবাইল না থাকলেও স্ত্রীর মোবাইল রয়েছে।
আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে খাট ও আলমারি তার নিজের এবং স্ত্রীর আছে সুকেজ।
স্থাবর সম্পদ বলতে এই প্রার্থীর বা তার পরিবারের অন্য কোন সদস্যের কোন কৃষি ও অকৃষি জমি নেই। এছাড়াও বাড়ি বা কোন ঘরও নেই তাদের!
তবে ব্যাংকে কোন দায়-দেনা নেই তার।
তিনি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন মোট ১ লাখ টাকা। এই ব্যয় মেটাবেন তিনি কৃষিখাত থেকে। যদিও নগদ কোন টাকা নেই তার।
কাউন্সিলর প্রার্থী পিয়ারা বেগম শান্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘এসএসসি’ পাস। পেশা ব্যবসা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন তিনি। তার একটি খাবারের হোটেল রয়েছে।
কৃষিখাত থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ২০ হাজার টাকা এবং ব্যবসা থেকে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬’শ টাকা। তার নামে কোন মামলা নেই।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে এই প্রার্থীর নগদ আছে ২০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে আরো ৫ হাজার টাকা।
স্বর্ণালঙ্কার আছে ১ ভরি ওজনের চেয়ে কিছু কম।
এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে টিভি ও ফ্রিজ। আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে কাঠের খাট, আলমারি এবং ওয়ারড্রব।
ব্যাংকে কোন দায়-দেনা নেই তার। তিনি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েেন মোট ২৫ হাজার টাকা। এই ব্যয় মেটাবেন তিনি অনুদান এবং হাস-মুরগি পালন থেকে হওয়া আয় থেকে।
কাউন্সিলর প্রার্থী আক্তারুজ্জামানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘এসএসসি’ পাস।। পেশায় তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ব্যবসা থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ৩৫ হাজার টাকা এবং কৃষিখাত থেকে আয় আরো ২৪ হাজার টাকা। কোন মামলা নেই তার নামে।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে এই প্রার্থীর নগদ আছে ২৫ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে আরো ২৫’শ টাকা। তবে তার স্ত্রীর নগদ বা ব্যাংকে কোন টাকা জমা নেই।
তার কোন স্বর্ণালঙ্কার নেই। তার স্ত্রীর কোন স্বর্ণালঙ্কার আছে ২ ভরি।
এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে টিভি ও ফ্রিজ। আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে খাট, আলমারি এবং সুকেজ।
এছাড়াও অন্যান্য আরো ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা রয়েছে তার।
স্থাবর সম্পদ বলতে কৃষি জমি আছে ১০ শতাংশ। অকৃষি জমি আছে ৫ শতাংশ।
এই প্রার্থীর বাড়ি রয়েছে একটি। ব্যাংকে কোন দায়-দেনা নেই তার।
তিনি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন মোট ৫০ হাজার টাকা। এই ব্যয় মেটাবেন তিনি নিজের ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে।
কাউন্সিলর প্রার্থী আশরাফুল হক নাইমের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘আষ্টম’ শ্রেণী পর্যন্ত বলে উল্লেখ করেছেন হলফনামায়। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। ব্যবসা থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ৪৮ হাজার টাকা।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে এই প্রার্থীর নগদ আছে ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে আরো ২১’শ টাকা। তার স্ত্রীর নগদ ও ব্যাংকে কোন টাকা নেই। তবে তার নিজের কোন স্বর্ণালঙ্কার না থাকলেও তার স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার আছে ৩ আনা।
এছাড়াও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে টিভি এবং ফ্রিজ। আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে খাট, সোফা এবং ওয়ারড্রব।
স্থাবর সম্পদ বলতে কৃষি জমি আছে ২ শতাংশ এবং অকৃষি জমি রয়েছে ১ শতাংশ।
এই প্রার্থীর ভাড়া দেওয়া বিল্ডিং রয়েছে একটি।
ব্যাংকে কোন দায়-দেনা নেই তার।
তিনি নির্বাচনী ব্যয় দেখিয়েছেন মোট ৫০ হাজার টাকা। এই ব্যয় মেটাবেন তিনি নিজের ব্যবসা থেকে।
খসড়া ভোটার তালিকা অনুযায়ী ৫ নং ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ হাজার ৬২৯ জন। ভোট কেন্দ্র ২ টি। ভোট কেন্দ্র ২ টি। বালীগাঁও মডেল সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয় এবং বালীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়।
হলফনামার তথ্য দিয়ে কার কী?
নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে হলফনামার মাধ্যমে কমিশনকে সম্পদের বিবরণসহ আট ধরনের তথ্য দিতে হয়। কিন্তু এই তথ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন কী করে? ভুল বা অসত্য তথ্য দিলে কি কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়?
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জনা যায়, ‘‘নির্বাচন কমিশন নিজে কোনো তথ্য যাচাই-বাছাই করে না। তবে কেউ কোনো অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখে। নির্বাচন কমিশন তথ্য পর্যবেক্ষণ করে। প্রয়োজন হলে তদন্তও করেন।”
”হলফনামার উদ্দেশ্য হলো এলাকার ভোটাররা যেন প্রার্থীদের সম্পর্কে জানতে পারেন। তারা যেন ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে এসব তথ্য কাজে লাগাতে পারেন। যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে পারেন।”
”তবে নির্বাচন কমিশন নিজ উদ্যোগে এসব তথ্য যাচাই বা অনুসন্ধান করে দেখে না। প্রার্থীরা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আদালতের সামনে এসব তথ্য ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন তাদের দেয়া তথ্য সত্য বলে ধরে নেন। তবে কেউ কোনো অভিযোগ করলে আর সেটা যদি নির্বাচন সংক্রান্ত হয় তাহলে কমিশন সেটা দেখে। নির্বাচনের পরেও ইলেকশন ট্রাইব্যুনালে এই অভিযোগ করা যায়।”
”তবে দুর্নীতি, সম্পদের বিবরণীতে অসত্য তথ্য দিলে সেটা সরকারের অন্যকোনো দায়িত্বশীল সংস্থাও যেকোনো সময় দেখতে পারে। বিশেষ করে সম্পদ, আয়, এর উৎস এগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন দেখতে পারে।
দুর্নীতি দমন কমিশন প্রার্থীদের এইসব হলফনামার তথ্য পর্যবেক্ষণে করে। হলফনামা ধরে কেউ যদি কোনো অভিযোগ করে তাহলে দুদক তদন্ত করে।”
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচনের রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) বিকেলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর। গত ৪ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়েছে। কালীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনের জন্য মেয়র পদে চারজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও সাধারণ কাউন্সিলর পদে এক নরীসহ ৩৪ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১০ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
১১ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, ১২ ফেব্রুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ এবং আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হবে। পৌরসভায় নয়টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং তিনটি সংরক্ষিত ওয়ার্ড রয়েছে।
ভোটার তালিকা অনুযায়ী কালীগঞ্জ পৌরসভার মোট ভোটার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৬৪০ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৮ হাজার ৩২১ জন ও মহিলা ভোটার ১৮ হাজার ৩১৯ জন। আর ১৭টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
জানা যায়, ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কালীগঞ্জ পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়।
এরপর ২০১৩ সালের ২০ জুন কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ওই নির্বাচনে মেয়র পদে দুজন, নয়টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৫২ জন ও তিনজন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সে সময় পৌরসভার মোট ভোটারসংখ্যা ছিলো ৩০ হাজার ৪৯৬ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ১৫ হাজার ৪০১ জন ও নারী ১৫ হাজার ৯৫ জন।
আরো জানতে……..
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচন: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচন: মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচনে লড়াই হবে ত্রিমুখ
পৌর নির্বাচন: আতাব উদ্দীনের ‘ঋণ’ কোটি টাকা, বাদল এগিয়ে শিক্ষায়, আকরাম ব্যবসায়ী
পৌর নির্বাচন: শিক্ষা ও অর্থ-সম্পদে এগিয়ে আফসার, ‘তথ্য গোপন’ রয়েছে চান্দু মোল্লার!
পৌর নির্বাচন: হাসেম ভূইয়া এগিয়ে অর্থ-সম্পদে, মোমেন মামলায়, আরমান ‘অক্ষরজ্ঞান সম্পূর্ণ’
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচন: শিক্ষা ও অর্থে এগিয়ে স্বতন্ত্র, ব্যবসায়ী আ.লীগ, মামলায় এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী
কালীগঞ্জে ৪ মেয়র প্রার্থীসহ ৪৯ জনের মনোনয়ন দাখিল
খসড়া তালিকা অনুযায়ী কালীগঞ্জ পৌরসভার মোট ভোটার ৩৯ হাজার ৮৩৫ জন, ভোট কেন্দ্র ১৭ টি
কালীগঞ্জ পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আ.লীগের মনোনয়ন পেলেন এস এম রবীন হোসেন
কালীগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন ২৮ ফেব্রুয়ারি: ভোট ইভিএমে, থাকবে না সাধারণ ছুটি