গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গাজীপুরে গত চার বছরে সাতটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই সাত কারখানার তিনটিই ছিল অনুমোদনহীন। বাকিগুলোর অনুমোদন থাকলেও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সর্বশেষ গত রবিবার সন্ধ্যায় অনুমোদনহীন লাক্সারি ফ্যান কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১০ শ্রমিক। জানা গেছে, এখনো ৬০-৬৫টি অনুমোদনহীন কারখানা রয়েছে গাজীপুরে।
কারখানা স্থাপনে স্থানীয় সরকার, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিপ্তরের ছাড়পত্র ও অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু দুর্ঘটনা বা আগুন লেগে প্রাণহানির পর ছাড়া ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কোনো তৎপরতা থাকে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কারখানার মালিকদের পাশাপাশি সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সব মহলে।
১৮ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠ- পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আগুন লেগে মৃত্যুর পরই শুধু তৎপরতা বাড়ে’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ সকল তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে গত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছরে সাতটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৮২ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর সর্বাধিক ৩৩ জন প্রাণ হারান টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায়। তা ছাড়া গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরের মাল্টিফ্যাব গার্মেন্টে বয়লার বিস্ফোরণে ১৩ জন, কালিয়াকৈরের এফএস কসমেটিকে পাঁচজন, শ্রীপুরের অটো স্পিনিংয়ে ছয়জন, টঙ্গীর ন্যাশনাল ফ্যান কারখানায় দুজন, পুবাইলের স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যালে সাতজন এবং গত রবিবার সন্ধ্যায় রওজা হাইটেকের লাক্সারি ফ্যান কারখানায় ১০ জনের মৃত্যু হয়।
এই কারখানাগুলোর মধ্যে লাক্সারি ফ্যান, স্মার্ট মেটাল ও এফএস কসমেটিকসের কোনো অনুমোদন ছিল না। স্মার্ট মেটাল পুরনো টায়ার পুড়িয়ে ভেজাল বিটুমিন ও তেল, লাক্সারি ফ্যান কারখানায় সিলিং ফ্যান এবং এফএস কসমেটিকে মেহেদী, সেভিং ফোম, সেভিং ক্রিম, চুলের কলপসহ বিভিন্ন ধরনের কসমেটিস তৈরি করা হতো। অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ঘটানো অন্য চার কারখানার বিরুদ্ধেও ছিল নানা অনিয়মের অভিযোগ। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। তা ছাড়া অন্য দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত কোনো কারখানা ছিল না ত্রুটিমুক্ত।
পুবাইলের বাসিন্দা আলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি স্মার্ট মেটালে বিস্ফোরণের ফলে অগ্নিকাণ্ডে সাতজনের মৃত্যুর আগে কারখানাটি চলেছে পাঁচ বছর। টায়ার পোড়ানোর কারণে বিষাক্ত ধোঁয়ায় এলাকার মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। কারখানা বন্ধের জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কলকারখানা এবং প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাজীপুর অফিসগুলোতে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দুর্ঘটনার পর সাত শ্রমিকের মৃত্যু হলে পুলিশ বাদী হয়ে কারখানার মালিক-ম্যানেজার ও জমির মালিককে আসামি করে মামলা করেছিল। ঘটনার পর জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। দুই কমিটিই দুর্ঘটনার জন্য কারখানার মালিক পুবাইলের বসুগাঁও এলাকার ইমান উদ্দিন, জমির মালিক বাছেদ বেপারী, কারখানার ম্যানেজার মো. শাহীন (৩৫), কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক অধিদপ্তরের গাজীপুরের সাবেক দুই উপমহাপরিদর্শক মো. সহিদুল ইসলাম ও ফরিদ আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুরের তত্কালীন উপপরিচালক সোনিয়া সুলতানা ও পুবাইল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সুলতান উদ্দিন আহমেদকে দায়ী করে। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি। কিন্তু এক বছরের মাথায় পুলিশ কারখানার মালিক, জমির মালিক ও ম্যানেজারকে মামলা থেকে বাদ দিয়ে প্রতিবেদন দিলে আসামিরা অব্যাহতি পান। সরকারি কর্মকর্তা ও সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়নি কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
ওই দুর্ঘটনায় নিহত রিকশাচালক স্বাধীন মিয়ার ছেলে আরিফ হোসেন (২২) বলেন, ঘটনার পর সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা দেখে অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম কারখানার মালিক গ্রেপ্তার হবে, বিচার হবে। একটি দুটি নয়, সাতজন মানুষ পুড়ে মরল। কিন্তু তাঁদের কিছুই হলো না।
দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড কারখানা ভবন ছিল পুরনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ছিল না কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নবায়ন ছিল না।
গাজীপুর উন্নয়ন পরিষদের সম্পাদক মনির হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে তারা আগে কী করে। অনুমোদন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান কিভাবে উত্পাদন করছে, ভ্যাট ট্যাক্স দিচ্ছে কি না, বিদ্যুত্ সংযোগই বা কিভাবে পায়, এলসি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিভাবে করে—এসব বিষয় যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। যদি কোনো কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা থাকে ওই দুর্ঘটনার জন্য তাঁদেরও বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, লাক্সারি ফ্যানের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার ফায়ার লাইসেন্স ছিল। ওপরের তলার টিনশেডের ছিল না। তিনি নতুন এসেছেন। কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা তদন্ত করে দেখবেন। শিল্পনগরী হিসেবে গাজীপুরের সব কারখানাতেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে দেখা হবে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের গাজীপুরের উপমহাপরিদর্শক ইউসুফ আলী ৬০-৬৫টি অনুমোদহীন কারখানা থাকার কথা স্বীকার করে জানান, লাক্সারি ফ্যান কারখানাটি প্রত্যন্ত গ্রামে চলছিল। তাই তাদের নজরে আসেনি। কেউ অভিযোগও করেনি।
অন্য অনুমোদনহীন কারখানাগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ছোট গার্মেন্ট। কাজ না থাকার কারণে এসব কারখানা এখন বন্ধ। এসব কারখানা বন্ধের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তা ছাড়া তাদের জনবলেরও ঘাটতি থাকার কারণে কাজ করতে দেরি হচ্ছে।
আরো জানতে…
ফ্যান কারখানার অগ্নিকাণ্ডে ‘কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং ভবন মালিক উভয়ই দায়ী’: তদন্ত কমিটি
ফ্যান কারখায় অগ্নিকাণ্ড: পাঁচ মালিকসহ জিএম ও পিএমকে আসামি করে মামলা
লাক্সারি ফ্যান কারখানার অনুমোদনই ছিল না
‘লাক্সারি ফ্যান’ ফ্যাক্টরির অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ শ্রমিকের লাশ হস্তান্তর
ফ্যান তৈরির কারখানায় নিহত শ্রমিকদের ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা শ্রম প্রতিমন্ত্রীর
লাক্সারি ফ্যান তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ড: ১০ শ্রমিক নিহত(ভিডিও)