চাকরি হারিয়ে কষ্টে কয়েক লাখ পোশাক শ্রমিক

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : করোনা খুব একটা আক্রান্ত করতে পারেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিটা রক্ষা করা যায়নি। কষ্টে দিন কাটছে এমন অনেক শ্রমিকের। তবে বিজিএমইএ-এর দাবি এক কারখানা থেকে কাজ হারালেও অনেক শ্রমিক অন্য কারখানায় চাকরি পেয়েছেন।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করছেন রফিকুল ইসলাম। এই কাজ তিনি শুরু করেছেন দুই মাস হয়েছে। গত বছরের মে মাসে গাজীপুরের তোহাব ফ্যাশন নামক গার্মেন্টস থেকে চাকরি চলে যায় পঞ্চগড়ের এই বাসিন্দার। রোজগারের আশায় ফিরেছিলেন গ্রামে। কিন্তু সেখানেও কোন কাজ নেই। বাধ্য হয়ে গত মার্চে ঢাকায় ফিরেন রফিকুল। ভ্যানে শুরু করেন সবজি বিক্রি।

তিনি বলেন, ‘‘যে মাসে চাকরি চলে যায় সেই এক মাসের বেতন সঙ্গে সামান্য কিছু টাকা দেয়া হয়েছিল। বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। দেশে কোন জমি জমাও নাই যে করে খাব। বাড়িতে মা বোন নিজের স্ত্রী সন্তানরা রয়েছে। তাদের খরচ যোগাতে হয়। তাই ঢাকায় ফিরে এই কাজ শুরু করেছি।’’

শুধু রফিকুল নন তার মতো দেশের তৈরি পোশাক কারখানার বহু শ্রমিক করোনার আঘাতে চাকরি হারিয়েছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী যার সংখ্যা তিন লাখ ৫৭ হাজার, যা মোট শ্রমিকের ১৪ শতাংশ। তাদের কেউ কাজ জোটাতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। বহু বছর কাজ করেও অনেকেই যথাযথ পাওনা বুঝে পাননি।

মালিবাগের একটি কারখানায় কাজ করেন মিম আক্তার। তিনি বলেন, ‘‘করোনা শুরুর পর আমার কারখানা থেকে একশ’ জনের মতো শ্রমিকের চাকরি গেছে৷ এখন আমরা ৬০০ জনের মতো কাজ করি। যাদের চাকরি গেছে তারা কোন পাওনাই পাননি। একজন তো ২০ বছর এখানে চাকরি করেছেন। তাকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রতিদিনই মেশিন দিয়ে টেম্পারেচার মাপার পর বলা হতো তাপমাত্রা ১০০ এর উপরে। এভাবে কয়েক সপ্তাহ ঘোরানোর পর একদিন বাদ দিয়ে দেয়। সামান্য কিছু টাকা দিয়েছে। এভাবে যাদের চাকরি গেছে, তারা কেউই ভালো নেই। অনেক কষ্টে এখন তাদের দিন কাটছে।’’

গত জানুয়ারিতে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্প ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি) তাদের গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ৫০ শতাংশের বেশি কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে। কোভিড মহামারি বিবেচনায় আরএমজি খাতে ‘ক্ষতি, ক্ষমতা এবং পুনরুদ্ধার: মাঠ জরিপ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল’ শীর্ষক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, এ পর্যন্ত তিন লাখ ৫৭ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশ আবারও কাজে ফিরতে পেরেছেন। তিন হাজার ২১১টি নথিভুক্ত কারখানার মধ্যে ৬১০টি কারখানা থেকে তথ্য নিয়ে এই গবেষণায় চালানো হয়।

গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘‘আমরা গবেষণায় যেটা পেয়েছি, তাতে যে এক তৃতীয়াংশ কাজে ফিরতে পেরেছেন তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশ আগের বেতনেই ফিরেছেন। নয় শতাংশের বেতন কমে গেছে। সংকট এতটাই মারাত্মক যে, মাত্র ৪৪ শতাংশ কারখানা ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছয় মাসের অর্ডার নিশ্চিত করতে পেরেছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ কারখানা বিভিন্ন স্তরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং ১১ শতাংশ কারখানা ‘অনেক বেশি’ অনিশ্চয়তায় আছে। ২৩২টি কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বলা হয়, গার্মেন্টসে ২৬ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন। আমরা গবেষণায় দেখেছি যে সাড়ে তিন লাখের মতো শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন সেটা এই খাতের প্রায় ১৪ শতাংশ। যারা কাজ হারিয়েছেন তারা ন্যায্য পাওনা পাননি। মাত্র ১৪ শতাংশ মালিক বলেছেন, তারা চাকরিচ্যুতদের ন্যায্য পাওনা দিতে পেরেছেন।’’

গত ২৯ এপ্রিল প্রকাশ করা ‘দি উইকেস্ট লিঙ্ক ইন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন : হাউ দ্য প্যানডেমিক ইজ অ্যাফেক্টিং বাংলাদেশ গামেন্টস ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতবছর করোনা শুরুর পর দেশের ৩৫ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের অন্তত ১৫ শতাংশ করে বেতন কমেছে। এছাড়া বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, শিপমেন্টে দেরি হওয়া, সময়মতো পণ্যের মূল্য না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে পোশাকখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। করোনার অজুহাতে নারী শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বেশি। অনেকের বেতন কমানো হয়েছে। বাধ্য হয়ে কর্মীরা ধারদেনায় জড়িয়েছেন। ইউএনডিপি ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ‘চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’ এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বিজনেস’ এই গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, ‘‘যেসব শ্রমিকের চাকরি গেছে তারা কেউ ভালো নেই। মালিকপক্ষ নানা অজুহাতে তাদের কোন টাকা পয়সা না দিয়েই বিদায় করে দিয়েছেন৷ আমরা বলেছি, সামাজিক সুরক্ষা ও বেকারত্বের সময়ে তাদের একটা ভাতার ব্যবস্থা করতে ইন্সুরেন্স করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১১৫ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। সেই টাকা দিয়ে যারা চাকরি হারিয়েনে তাদের ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। মালিকরাও নানা সংকটে আছেন, কিন্তু একজন শ্রমিকের চাকরি চলে গেলে তিন কী করবেন?’’

বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘‘শ্রমিকদের চাকরি যাওয়ার যে হিসাবটা বলা হচ্ছে সেটা ঠিক না। প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে তো শ্রমিক দরকার। এক প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি গেলে, অন্য প্রতিষ্ঠানে কিন্তু তারা চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন।’’

বাংলাদেশের গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) এর হিসাব অনুযায়ী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭৩২ জন শ্রমিক। শ্রমিকদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া নিয়ে গত বছরের মে মাসে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি। তাদের রিপোর্টে তখন পর্যন্ত ৯৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে ১০ জন শ্রমিক ও একজন কর্মকর্তা মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল আর অন্যদের উপসর্গ ছিল।

জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘‘প্রথমদিকে মালিকরা কিছু তথ্য দিলেও পরে আর তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে আমরা শেষ পর্যন্ত কত শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছেন সে তথ্য আনতে পারিনি। আসলে গার্মেন্টসে শ্রমিকদের খুব একটা টেস্টও করা হয়নি। ফলে কতজন আক্রান্ত তার সঠিক কোন হিসাব পাওয়া মুশকিল। অনেকেই অসুস্থ্য হয়েছে, আবার সুস্থ্য হয়ে কাজেও যোগ দিয়েছে।’’

শ্রমিকদের করোনা পরীক্ষা করানো হচ্ছে না এমন অভিযোগ মানতে নারাজ বিজিএমইএ সভাপতি। তিনি জানান, বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে তিনটি পিসিআর ল্যাব বসানো হয়েছে। প্রতিটি ল্যাবে প্রতিদিন এক হাজার ৬০০ জনের পরীক্ষা করানো যেত। সেখানে গড়ে ২২৪ জনের পরীক্ষা হয়েছে। ‘‘এতে মালিকদের অনেকটা গচ্চাও দিতে হয়েছে। আমরা পাঁচ হাজার শ্রমিকের টেস্ট করিয়েছি, সেখানে ৭৩২ জন করোনা পজেটিভ এসেছে।”

গার্মেন্টসে শ্রমিকরা কম আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে ফারুক হাসান বলেন, ‘‘এদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ৯১ শতাংশ শ্রমিক থাকেন গার্মেন্টসের আশপাশেই। ফলে তাদের গার্মেন্টসে আসতে কোন যানবাহনে উঠতে হয় না। এছাড়া ঈদের আগে সবগুলো গার্মেন্টসে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। এখন তো আমাদের অর্ডার কমে গেছে। আগামী তিন মাস আমাদের জন্য কঠিন সময়। অনেক বায়ার এই ব্যবসা ছেড়েই চলে গেছেন। ফলে আমরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিন পার করছি।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে