দুর্নীতির সাথে ‘কমপ্রমাইজ’ করতে চাই না: ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

জনগণকে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের তৎপর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দুর্নীতির সাথে ‘কমপ্রমাইজ’ করতে চাই না: ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

দুর্নীতির সাথে আপস করতে চান না বলে জেলা প্রশাসকদের বার্তাদের দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পাশাপাশি জনগণকে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের তৎপর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

রবিবার (০৩ মে) জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, “সুশাসন বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি আমরা করতে চাইছি। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং অবশ্যই জবাবদিহিতা।

“দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। সেটি হচ্ছে আমরা ‘কমপ্রমাইজ’ করতে চাই না দুর্নীতির সাথে।”

সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন।

দেশের ৬৪ জেলার ডিসি এবং বিভাগীয় কমিশনারদের সামনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত যে জুলাই সনদ, এটার প্রতিটি দফা প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।

“আমি আশা করব, আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে ইনশাআল্লাহ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।”

মাঠ প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন। একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সরকারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।”

নির্দেশনামূলক বক্তব্যে সরকারপ্রধান বলেন, “প্রয়োজনের অতিরিক্ত আইন কানুন ও জটিতলতাকে অজুহাত হিসেবে আমরা ব্যবহার না করি বরং বাস্তবসম্মত কার্যকর ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা আমরা প্রশাসনের সকল পর্যায়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। যাতে করে জনগণ সময়মত সরকারের প্রতিটি কর্মসূচির প্রত্যাশিত যে সুফল লাভ করতে পারে।”

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়নের কর্মকাণ্ডের ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এই সম্মেলনে চলাকালে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

‘সততা-মেধাই পদোন্নতির মূলনীতি’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনের নিয়োগ বদলি কিংবা পদোন্নতির মূলনীতি। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সাথে শূন্য পদে জনবল নিয়োগ, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন, বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

‘ডিসিরা মাঠ পর্যায়ের অ্যাম্বাসেডর’

জেলা প্রশাসকদের মাঠ পর্যায়ে ‘সরকারের দূত’ বলে আখ্যায়িত করে সরকারপ্রধান বলেন, “এই সম্মেলন কেবল আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের জায়গা হওয়া উচিত নয়। বরং এটি এমন একটি পরিসর যেখানে মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা প্রয়োজন এবং উদ্ভাবনী চিন্তা সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হতে পারে বা হওয়া উচিত।”

নিয়মিত বাজার তদারকির তাগিদ

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় থাকার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যে অত্যন্ত জরুরি সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, “ইচ্ছামত যাতে কেউ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে কিংবা যে প্রবণতাটা আমরা দেখি বিভিন্ন সময় মজুদারি বা কারসাজির মাধ্যমে বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে, কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা কেউ করতে না পারে, এ জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “কৃষকের জন্য সার, বীজ, সেচ সংরক্ষণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও আমাদের জন্য জরুরি। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের বিষয় হিসেবে নয় বরং গ্রামীণ জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনগণের শহরমুখিতার হ্রাস এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিয়ামক হিসেবে আমার মনে হয় দেখা প্রয়োজন।”

ভ্রাম্যমাণ আদালত দৃশ্যমান করার তাগিদ

ইরান যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় যে সংকট চলছে তার প্রভাবের বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সন্ধ্যা ৭টার পরে আমরা চাইছি যে, বিভিন্ন মার্কেট প্লেসগুলোতে যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার না হয়। এ ব্যাপারেও আপনাদেরকে একটু খেয়াল রাখার প্রয়োজন, খেয়াল রাখতে হবে।”

আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে এবং যাতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অপরাধ দ্রুত দমন করা যায় সে জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও দৃশ্যমান করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ডিসিদের নির্দেশনা দেন।

‘সরকারি সেবায় হয়রানি বন্ধ করতে হবে’

জনগণের ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি সহজতর করা এবং সরকারি সেবাকে হয়রানি মুক্ত করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আমি মনে করি আপনাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় অংশ।

“সরকারি কার্যালয়ে সেবা প্রার্থীরা যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি না হয় কিংবা বিলম্ব বা অনিয়মের শিকার না হয়, দয়া করে সে ব্যাপারে আপনাদেরকে কঠোর নজর রাখতে হবে। ”

জনগণের যেকোনো ন্যায্য অভিযোগকে গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন তারেক রহমান।

‘নারী ও শিশু নির্যাতন ও খাদ্য ভেজাল প্রসঙ্গে’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি অবস্থান থেকেও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকদের তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।

আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও ডিসিদের কঠোর ব্যবস্থার নেওয়ার নির্দেশনাও এসেছে তার কাছ থেকে।

তারেক রহমান বলেন, “খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। এই খাবারটি আপনি খাচ্ছেন, আমি খাচ্ছি, আপনার পরিবারের সদস্য আপনার সাথে থাকছে, তারাও খাচ্ছে। কাজেই এটির প্রতি আমাদের নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।”

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গ’

বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে এবং এ বিষয়ে সবাই যে ওয়াকিবহাল, তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে অবশ্যই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরকেও সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে হবে।”

তিনি বলেন, “চতুর্থ বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে জনপ্রশাসনের কার্যক্রমকে আরো কীভাবে সময়োপযোগী, দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করা যায়, এটি বোধহয় আমাদের এখন চিন্তা করা উচিত হবে।

আমি মনে করি, যেহেতু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলেন এইগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের এই বিষয়ে ‘ডেভেলপ’ করা ছাড়া বিকল্প কোনো কিছু নেই।”

স্থানীয় নেতৃত্বের সাথে সমন্বয়ের তাগিদ

স্থানীয় নেতৃত্ব সাথে সমন্বয় ও উদ্যোগী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর মাধ্যমে জনপ্রশাসনকে গণমুখী করা গেলে জনগণ সরকারের কার্যক্রমের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে না মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, “রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের যাবতীয় গণমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকার জনপ্রশাসনের উপরে নির্ভরশীল। বিভিন্ন খাত চিহ্নিত করে সরকার দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

“তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। খেলাধুলা সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড এবং জনস্বার্থে স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।”

খাল খননসহ এরকম স্বেচ্ছাসেবামূলক আরও কর্মকাণ্ডের উদাহরণ টানেন সরকারপ্রধান।

‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেন বিশেষ সময়ে হবে?’

সারাদেশে নারী, শিশু ও তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরির বিষয়ে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি শনিবার সিলেটে অনুষ্ঠানের (নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস) উদাহরণ টানেন।

শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে জেলা প্রশাসকদের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতা শুরু করতে তৎপর হওয়া তাগিদ দের সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, “কেন স্পোর্টস সবসময় শীতকাল আসলে হতে হবে? কেন অন্য সময়ও স্পোর্টস হতে পারবে না। কেন কালচারাল অনুষ্ঠান ওই ২৬ মার্চেই হতে হবে, ১৬ ডিসেম্বর হতে হবে, ২১ ফেব্রুয়ারিতে হতে হবে স্কুল পর্যায়ে? কেন আমরা এটা পরিবর্তন করতে পারব না। কেন সারা বছর হতে পারবে না?”

জেলায় জেলায় শিল্পকলা একাডেমি, জেলা পরিষদ ভবনে নারীদের বানানো জিনিসের প্রদর্শনীর আয়োজনের বিষয়ে ডিসিদের সক্রিয় হতে বলেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, “সারা বছরই কম বেশি সপ্তাহে যদি একটা অনুষ্ঠানও থাকে, তাহলে মানুষের যাবার জায়গা থাকে। এইসব কাজের মাধ্যমে আমরা যেটা দেখছি, আমাদের তরুণ সমাজ অন্য বিষয়, যেটা প্রত্যাশিত না, এরকম অনেক কিছুর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে তারা। আমরা যদি আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে এই এরকম খেলাধুলা বলেন, সংস্কৃতি বলেন, এই ধরনের বিষয়গুলোতে আমরা ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত করতে পারি তাহলে আমার মনে হয় তারা এগুলো থেকে আস্তে আস্তে সরে আসবে। তাদেরকে তো আমাদের ‘অপশন’ দিতে হবে।”

তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মানসিক ও শারীরিক যে শক্তি আছে সেটা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আমি যদি সেই রাস্তাটা তাকে না দিই স্বাভাবিকভাবে সে অন্য কিছুতে জড়িত হয়ে যাবে।”

জাতীয়ভাবে যেরকম একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে সমাজে কোনো ব্যক্তির অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয় তেমনি জেলা পর্যায়ে সামাজিক ভালো কাজকে উৎসাহিত করতে জেলা প্রশাসকদের উদ্যোগী হতে বলেছেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের মধ্যে যারা ভালো করছেন, তাদের মনোনীত করে কেন্দ্রে পাঠালে তাদের পুরস্কার বা সম্মাননা দেওয়া ব্যবস্থা করবে সরকার।

এসবের মাধ্যমে সমাজে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা যদি এই উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেন, আমরা এখান থেকে আপনাদেরকে সাপোর্ট দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই এই জিনিসগুলোকে।”

‘প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র চাই’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা একটি প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক এবং নৈতিক রাষ্ট্র করতে চাই, যা আপনাদের সামনে এতক্ষণ আমি আমার নিজের কথাটি বলার চেষ্টা করেছিলাম।”

ধর্ম-বর্ণ ও নৈতিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমি জানি কেউ আমার সাথে ‘অ্যাগ্রি’ করবেন, কেউ আমার সাথে ‘অ্যাগ্রি’ করবেন না। আমি যেটা বিশ্বাস করি আমি সেটাই বলছি।”

‘জাতীয় ঐক্য বড় শক্তি’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় ঐক্যই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, মতভেদ থাকাটাই আমাদের মধ্যে স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের স্বার্থে আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, দেশের স্বার্থে আমি বিশ্বাস করি ‘সবার আগেই বাংলাদেশ’।”

তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থার যে আকাঙ্ক্ষার সাধারণ মানুষের ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে বর্তমান সরকার।

“স্বাভাবিকভাবেই জনগণ সরকারের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষার একটি বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাইবে।”

জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, “সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনারা, বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকগণ জনগণের সঙ্গে সরকারের প্রধান সেতুবন্ধন। আপনাদের সততা কর্মদক্ষতা এবং দায়বদ্ধতার উপরে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সাফল্য বলা যায়, প্রায় পুরোই নির্ভর করে।”

দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। যে পরিস্থিতিটির বর্ণনা আমি দিলাম সেই পরিস্থিতি ছিল যখন আমরা কাজ শুরু করেছি। অবশ্যই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের সহযোগিতায় অনেকখানি সেই পরিস্থিতিটা আমরা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছি এই আড়াই মাসে। তবে সম্পূর্ণভাবে সেটি এখনো পরিবর্তিত হয়নি।”

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসন আমলে ‘দুর্নীতি, লুটপাট ও জনগণকে ঋণগ্রস্ত’ করে ফেলা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “৩০ লক্ষ কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়েই বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।”

বিগত সরকার দেশকে ‘আমদানিনির্ভর’ করে ফেলেছিল বলে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে, দেশে বেকারত্ব বেড়েছে, নতুন কর্মসংস্থান হয়নি বললেই চলে।

প্রতিটি সাংবিধানিক এবং বিধিবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে ‘অকার্যকর’ করে ফেলা হয়েছিল বলে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদুক সবকিছুই ছিল অকার্যকর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব খাতেই বলা যায় ভঙ্গুর অবস্থা।

“অপরদিকে বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নতুন সরকারের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো দেশই রক্ষা পায়নি। সব দেশই কম বেশি ‘অ্যাফেক্টেড’ হয়েছে। বাংলাদেশও ‘অ্যাফেক্টেড’ হয়েছে।”

তবে জনগণের ভোগান্তি না বাড়িয়ে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় সেই চেষ্টা সরকার অব্যাহত রেখেছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকার আবহমানকালের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার দেশের প্রতিটি শ্রেণিপেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন পদক্ষেপের বাস্তবায়ন কাজ শুরু করেছে।”

তারেক রহমান তার সরকারের কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের প্রতিমাসে সম্মানী চালুর কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্র সমাজের প্রত্যেকটা মানুষকে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসাই হচ্ছে আমাদের বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।”

ডিসিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে জনগণের জন্য সরকারের গৃহীত সেই কর্মসূচিগুলিকে সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করবেন…এটি কিন্তু জনপ্রশাসনের কাছে সরকারের প্রত্যাশা।”

মন্ত্রি পরিষদের সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী এবং নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বক্তব্য রাখেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা।

এবারের সম্মেলনে মোট অধিবেশন থাকছে ৩৪টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন ৩০টি এবং অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংখ্যা হচ্ছে ৫৬টি।

বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব সম্মেলনে উত্থাপিত হবে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সম্মেলনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।

সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম জোরদারকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্ম-সৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্নেন্স, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।

সূত্র: বিডিনিউজ