গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : শিগগিরই দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে অন্তত আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ পরিস্থিতি বহাল থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার গ্যাস ও বিদ্যুতের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে এক পর্যালোচনা সভা শেষে তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ নিয়ে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা কমাতে চায় সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের উৎপাদন ও বিতরণ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে এ জরুরি পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা এতে সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।
এ সময় তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটা যুদ্ধের মতো। এ যুদ্ধ মোকাবেলায় সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলে যদি চেষ্টা করি, তাহলে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারব। আগামী সেপ্টেম্বরের দিকে ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ আসবে। একই সঙ্গে রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এছাড়া চট্টগ্রামের এস আলমের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এ সময় উৎপাদনে আসবে। ফলে তখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর নাগাদ গ্রিডে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে। সেখান থেকে কতটা কমাতে পারি, সে চিন্তা করা হচ্ছে। আমরা সাশ্রয়ী হলে হয়তো চাহিদা সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটে নামিয়ে আনতে পারব। বর্তমানে দোকানপাটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ করার পাশাপাশি অফিসের সময় কমিয়ে আনা যায় কিনা (৯টা-৩টা) সেই চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন অফিসে না গিয়ে ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কথাও ভাবা হচ্ছে।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এসির ব্যবহার ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা এবং ব্যবহার কম করলে হয়তো লোডশেডিং অনেক কম হবে। মসজিদে এসির ব্যবহার কমাতে হবে। বিয়েসহ সব অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করতে হবে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয়ও এখন লোডশেডিং হচ্ছে উল্লেখ করে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, জাপান, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয়ও লোডশেডিং হচ্ছে। তারাও সাশ্রয়ে মনোযোগী হচ্ছে। তাদের তুলনায় আমরা অনেক ভালো আছি। তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। জাপানের আয় আমাদের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। সেখানেও লোডশেডিং হচ্ছে। তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে লোডশেডিং সম্পর্কে গ্রাহকদের আগে থেকেই জানানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা সে প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়। এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, লোডশেডিংয়ের বিষয়টি কীভাবে আগে জানানো যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা করেছি। আগেই যদি লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে জানাতে পারি, তাহলে গ্রাহকরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারবে। এ নিয়ে ডিপিডিসি একটা অ্যাপ তৈরি করেছে। এ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা জানতে পারবে, কখন কোথায় লোডশেডিং থাকবে। সেটি নিয়ে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই জানানো হবে। মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন, তারা এটি বাস্তবায়ন করবেন। প্রয়োজনে তাদের আরো শক্তিশালী করা হবে, যাতে আমরা ঘাটতিটা কাটিয়ে উঠতে পারি।
এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সারা দেশে আলোকসজ্জা না করার নির্দেশনা জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পণ্যের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার এ নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল, দোকানপাট, অফিস ও বাসাবাড়িতে আলোকসজ্জা না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম এখন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করেছে জ্বালানি বিভাগ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন এরই প্রভাব পড়েছে। শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে মফস্বলেও এখন দিনে ও রাতে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য হলো, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে এর প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে লোডশেডিং করেও চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। জ্বালানি পণ্যের দাম না কমলে শিগগিরই এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না।