গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধান পাঁচটি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডাব্লিউইএফ)৷ প্রথমে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
আরো যে চারটি ঝুঁকি রয়েছে, তা হলো, ঋণসংকট, উচ্চ পণ্যমূল্যের ধাক্কা, মানবসৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি ও সম্পদের জন্য ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২২ সালের প্রথম ভাগের প্রেক্ষাপটে এই জরিপ। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে রিজার্ভ ও ডলার সংকটই বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নাম্বার ঝুঁকি। এখন জরিপ হলে এটাই হবে শীর্ষ ঝুঁকি।
ডাব্লিউইএফ-এর ধারণাগত এই জরিপে মোট ৩৫টি ঝুঁকির কথা বলা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হলে তারা ক্রমানুসারে ওই পাাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের মোট ৭২টি কোম্পানি জরিপে অংশ নেয়।
অন্যান্য দেশেও তারা এই জরিপ করেছে। তাদেরও শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হয়। সার্বিক জরিপ থেকে তারা সারা বিশ্বে আগামী দুই বছরের অর্থনৈতিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। জরিপের ফলাফল থেকে তারা বলছে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
বাংলাদেশে ডাব্লিউইএফ-এর অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
পরিস্থিতির ব্যাখ্যা
২০২১ সালের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে মূল্যস্ফীতি মাত্রা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৮৬ শতাংশ। পরের মাসে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমে ৯.১ শতাংশ হয়। ওই দুই মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় কারণ ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি। সেই সঙ্গে আছে জ্বালানির উচ্চ মূল্য।
চলতি বছরের শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। আর ২০২৪ সাল শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ হবে ১৩০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২১ সালে সুদসহ দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১১.৭ বিলিয়ন ডলার। ২২ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশকে দ্বিগুণ বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। এর পরিমাণ ২৩.৪ বিলিয়ন ডলার।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ খাদ্য, জ্বালানি তেল ও বিশ্ব রাজনীতিতে নানা সংকটের মুখে পড়ছে।
লার ও রিজার্ভ সংকটই শীর্ষে
সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরো ১৪০ দেশে একই প্রশ্নপত্রে এই জরিপ করা হয়। তিনি বলেন, ‘‘এখন যা পরিস্থিতি তাতে সহসা উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমবে না। ডলার সংকট, খাদ্যপণ্যের বিশ্বব্যাপী উচ্চমূল্য ও সংরক্ষণবাদী মনোভাব এখন চলমান। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও সব কিছু বিবেচনা করে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে এরকমই চলবে। দ্বিতীয়ার্ধে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ থেমে যায়, জ্বালানি তেল ও ডলারের সংকট কমে যায়, তবে বিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একটাই স্বস্তিদায়ক বিষয় হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ কৃষি এই সময়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে।’’
তার কথা, ‘‘প্রতি মাসে এখন রিজার্ভের এক বিলিয়নের বেশি ডলার কমে যাচ্ছে। এইভাবে রিজার্ভ সংকুচিত হতে থাকলে ২০-২৪ মাসে আমাদের রিজার্ভ তলানিতে চলে যাবে। তাই ডলার ও রিজার্ভ সংকট অনেক বড় আকারে দেখা দিচ্ছে। জরিপটি করা হয় গত বছরের প্রথম দিকে। যদি এই বছর করা হতো, তাহলে হয়ত এই সংকটটিই এক নাম্বার সংকট হিসবে আসতো। এই ডলার সংকট পিছিয়ে দিতে আমাদের বিদেশি ঋণ প্রয়োজন। সেটার ব্যবস্থা করতে হবে৷ এখানো বৈদেশি ঋণ-পরিস্থিতি ভালো আছে। আরো ঋণ নিয়ে তার ব্যবস্থাপনা ভালো করলে সংকট কাটাতে সহায়তা করবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। খাদ্য, জ্বালানি তেল নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ হচ্ছে। তেমনি ইউক্রেন ইস্যুতে রাজনৈতিক অবস্থানের চাপও বাড়ছে। বাংলাদেশ এখনো মধ্যবর্তী অবস্থানে আছে।’’
সংকট মোকাবেলার পরিকল্পনা
পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক, অর্থনীতিবিদ ড.আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিই ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকি থাকবে, কিন্তু ঝুঁকি মোকাবেলার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নই আসল কথা। ভারত যত সক্ষমতার সঙ্গে এটা করছে, আমরা তা পারছি না। আমরা চেষ্টাও করিনি। মূল্যস্ফীতি, ডলার ক্রাইসিস- এগুলোর জন্য ব্যাংকরেট বাড়ানো দরকার ছিল। মূদ্রানীতিকে আমরা ব্যবহার করিনি।’’
তিনি মনে করেন, ‘‘ঋণ সংকটটা মধ্য মেয়াদী। তবে ঋণ নিয়ে তা ঠিকমতো ব্যবহার করলে সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এখনো অনেক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, যা এখন নেয়া ঠিক না। হওড়ে এত টাকা খরচ করে উড়াল সেতু এখন আমাদের জন্য উচ্চাভিলাষী। আর ক্লাইমেট নিয়ে কথা হয়, কিন্তু কাজ হয় না।’’
‘‘তবে যেটা ওরা (ডাব্লিউইএফ) যেটা বলেনি, সেটা হলো, ডলার সংকট, ব্যাংকে তারল্য সংকট, রিজার্ভের সংকট। ওরা গত বছরের যে সময়ে জরিপ করে, তখন এই সংকট সামনে আসেনি। এখন জরিপ করলে এই সংকট এক নাম্বারে চলে আসতো,’’ অভিমত এই অর্থনীতিবিদের।
সূত্র: ডয়চে ভেলে