নিজস্ব সংবাদদাতা : কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আবুল হোসেন প্রিন্সকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
সোমবার (১৭ মার্চ) বিকেলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের তথ্য জানানো হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলা শাখার অধীনস্থ সরকারি কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আবুল হোসেন প্রিন্সকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, ছাত্রদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সাথে কোনরূপ সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো।
এর আগে রোববার (১৬ মার্চ) ভোররাতে ছাত্রদল নেতা প্রিন্সসহ তার ৫ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলো, কালীগঞ্জ সরকারি শ্রমিক কলেজ শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ভাদার্ত্তীর এলকার মোশারফ হোসেনের ছেলে আবুল হোসেন প্রিন্স (২৫), ছাত্রদল কর্মী ভাদার্ত্তীর নয়ন মিয়ার ছেলে হৃদয় মিয়া (২৪), মুনসেফপুর এলকার আমির হোসেনের ছেলে তরিকুল ইসলাম (১৯), বালীগাঁও এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে রিয়ান রহমান (১৯), হাফিজ উদ্দিন সুমনের ছেলে কামরুজ্জামান চয়ন (১৮) এবং শফিকের ছেলে সিহান হোসেন (১৮)।

স্থানীয় সূত্র ও থানায় দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার বালীগাঁও উত্তরপাড়া বাইতুল আমার জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজে ইমাম সুদের বিরুদ্ধে বয়ান করেন। সে সময় স্থানীয় হরমুজের ছেলে খোকন (৫৫), সোহেল (৪৮), সুমনসহ (৪৮) কয়েকজন ইমামের সাথে তর্কে লিপ্ত হন। এরপর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শনিবার (১৫ মার্চ) মসজিদের সভাপতি স্থানীয় ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি গোলজার হোসেন (৪৩) আসরের নামাজের পর বাড়ি ফেরার পথে শুক্রবারের ঘটনা নিয়ে খোকনের নেতৃত্বে তার পক্ষের লোকজন গোলজারের কাছে জানতে চান কেন তিনি ইমামের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি এবং ইমামের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে খোকন গ্রুপ গোলজারের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাকে বাঁচাতে আসা তার স্বজনদেরও মারধর করা হয়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়। বিকালে আহত বিএনপি নেতা গোলজার হোসেন চিকিৎসা নিতে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। কিছুক্ষণ পর প্রতিপক্ষের লোকজনও সেখানে হাজির হয়। সে সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে খোকন গ্রুপ কালীগঞ্জ সরকারি শ্রমিক কলেজ শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিন্সকে খবর দেয়। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে প্রিন্সের নেতৃত্বে ছাত্রদলের ১০-১৫ জনের একটি দল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন বিএনপি নেতা গোলজার ও তার সঙ্গে থাকা বিএনপি কর্মী হাবিবুল্লাহ, শামীম, সিরাজ মিয়া, আক্তার ও মোক্তারের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার আতঙ্কে জরুরি বিভাগের কর্মরত সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে জরুরি বিভাগে পুনরায় চিকিৎসা সেবা শুরু হয়।

এ ঘটনায় রাতেই উভয় পক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দায়ের করে। পরে রোববার ভোররাতে অভিযান চালিয়ে ছাত্রদল নেতা প্রিন্সসহ তার সহযোগী ছাত্রদলের ৫ কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে সকাল ৯টার দিকে থানা থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিতে থানার প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। প্রায় ১ ঘণ্টা থানার সামনে অবস্থান করার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পিছু হটে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।
পরে রোববার দুপুরে কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিলন মিয়া বাদী হয়ে, গ্রেপ্তার ৬ জনসহ অজ্ঞাত আরো ১৫ জনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ১৪৩, ১৮৬, ৩২৩, ৩৩২, ৩৫৩, ৫০৬, ১১৪ ধারায় মামলা দায়ের করেন {মামলা নং ১৭(৩)২৫}।
মামলায় পুলিশ উল্লেখ করে, শনিবার (১৫ মার্চ) বিকেলে থানায় সংবাদ আসে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কতিপয় শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী প্রবেশ করে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সরকারি কাজে বাধা দিয়ে সেবাপ্রার্থী রোগীদের চিকিৎসা সেবায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। সে সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও অন্যারা পুলিশকে জানায়, বালীগাঁও এলাকার মোঃ খোকন মিয়া, সোহেল মিয়া, সুমন মিয়া এবং মোঃ গোলজার হোসেন, হাবিবুল্লাহ, শামীম, সিরাজ মিয়া, আক্তার ও মোক্তার তাদের এলাকার মসজিদে ইমাম জুম্মার নামাজে সুদ-ঘুষ সর্ম্পকে আলোচনার প্রেক্ষিতে শনিবার বিকেল ৫টার দিকে দু’পক্ষ মারামারি করে আহত হয়। পরে তারা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে। কর্তব্যরত চিকিৎসক চিকিৎসা দেয়া শুরু করে। সে সময় খোকন মিয়ার পক্ষে প্রিন্স লাঠি-সোটা, লোহার রড নিয়ে তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে চিকিৎসার জন্য জরুরি বিভাগে অপেক্ষারত গোলজার হোসেন, হাবিবুল্লাহ, শামীম, সিরাজ মিয়া, আক্তার ও মোক্তারদের এলোপাথারী মারধর শুরু করে। এতে কর্তব্যরত রোগীদের চিকিৎসা সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এতে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সরকারি কর্তব্য পালন বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চিকিৎসক শুরু হয়।
ঘটনার পর কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শামিমা জানিয়েছেন, “জরুরি বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা চলাকালে হামলা হয়। আমরা তখন নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে থানায় খবর দেই। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।”
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইমরান খান জানিয়েছেন, “রোগীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তদন্ত শুরু করে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। হামলার কারণে চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হলেও বর্তমানে তা স্বাভাবিক রয়েছে।”
কালীগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম প্রধান জানিয়েছেন, অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদল নেতা হাসপাতালে তার বন্ধুর বাবাকে দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভেতরে সংঘর্ষে তার জড়িত থাকার পক্ষে এখনো পর্যন্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পাশাপাশি আমরাও দলীয় ভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান করছি। হাসপাতালে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়াও সংঘর্ষে জড়িত উভয় পক্ষ সমঝোতার বিষয়ে একমত হয়েছে।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আলাউদ্দিন জানান, সরকারি কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই ঘটনায় ছয়জনকে রোববার গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আরো জানতে…
কালীগঞ্জে সরকারি হাসপাতালে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, ছাত্রদলের ৬ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার