সিএনএন : ১৩৩৭ সালের মে মাসের এক সন্ধ্যায় লন্ডনের ব্যস্ত এক রাস্তায়, সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালের কাছে একটি গির্জার সামনে একদল লোক একজন যাজক জন ফোর্ডকে ঘিরে ধরে। তারা তাকে গলায় ও পেটে ছুরি মারে এবং পরে পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে পারলেও, মাত্র একজন খুনি কারাগারে যায়। আর যিনি হয়তো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের আদেশদাতা — ধনী ও প্রভাবশালী অভিজাত নারী এলা ফিটস্পেইন — তাকে কখনও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি, এমনটাই জানাচ্ছে ঐতিহাসিক দলিলপত্র।
প্রায় ৭০০ বছর পরে, এই নৃশংস ঘটনার পেছনের কাহিনি ও এর সঙ্গে জড়িত সম্ভ্রান্ত নারী সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। চুরির অভিযোগ, চাঁদাবাজি এবং জন ফোর্ডকে হত্যার মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন ফিটস্পেইন — যিনি ছিলেন নিহত যাজকের সাবেক প্রেমিকা।
ফোর্ড (যার নাম দলিলে কখনও “জন ডে ফোর্ড” বলেও এসেছে) সম্ভবত ফিটস্পেইনের নেতৃত্বাধীন এক অপরাধচক্রের সদস্য ছিলেন, সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক দলিল থেকে জানা গেছে। তারা ফ্রান্স-শাসিত একটি প্রিয়রি বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান লুট করে। ইংল্যান্ড-ফ্রান্স সম্পর্কের অবনতিকে কাজে লাগিয়ে তারা গির্জা থেকে চাঁদা আদায় করেছিল বলে গবেষকরা দাবি করেছেন, যা প্রকাশিত হয়েছে ৬ জুন ‘ক্রিমিনাল ল’ ফোরাম নামক জার্নালে।
কিন্তু পরে হয়তো ফোর্ড এই অপরাধচক্রের কথা তার ধর্মীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ফাঁস করে দেন। ১৩৩২ সালে ক্যানটারবেরির আর্চবিশপ একটি চিঠি লেখেন, যা এই গবেষণার মাধ্যমে জন ফোর্ডের হত্যার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। সেই চিঠিতে আর্চবিশপ এলা ফিটস্পেইনের নিন্দা করেন এবং তাকে একাধিক পুরুষের সঙ্গে, অবিবাহিত ও বিবাহিত — এমনকি ধর্মযাজকদের সঙ্গেও — পরকীয়ায় লিপ্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
চিঠিতে তার প্রেমিকদের মধ্যে একজন হিসেবে নাম উঠে আসে জন ফোর্ডের, যিনি ছিলেন ডরসেটে ফিটস্পেইন পরিবারের এস্টেটের একটি গ্রামের গির্জার রেক্টর। এই অপমানজনক অভিযোগের পর ফিটস্পেইনকে প্রকাশ্যে লজ্জাজনক পাপমোচনের আদেশ দেয় গির্জা। বছরের পর বছর পেরিয়ে, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে তিনি ফোর্ডকে হত্যা করান বলে দাবি করেছেন এই গবেষণার প্রধান লেখক, যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ম্যানুয়েল আইজনার।

এই ৬৮৮ বছর আগের হত্যাকাণ্ড “আমাদের দেখায় কীভাবে মধ্যযুগীয় সমাজে যাজকেরাও ধর্মীয় দায়িত্বের বাইরের জগতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন, এবং কীভাবে নারীরাও তাদের সম্পর্ক ও কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন,” বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জন’স কলেজের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক হান্না স্কোডা, যিনি গবেষণায় জড়িত ছিলেন না।
“এই ঘটনাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে, যেখানে ক্ষোভ জমেছে, প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে, আবেগ তুঙ্গে উঠেছে,” বলেন স্কোডা।
ফোর্ডের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন তথ্যগুলো মধ্যযুগীয় প্রতিশোধমূলক হত্যার ধর্ম ও প্রথা সম্পর্কেও জানায়, যেখানে এসব হত্যাকাণ্ড প্রভাব ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য জনসম্মুখে সংঘটিত হতো বলে মনে করেন অধ্যাপক আইজনার।
হত্যার মানচিত্র
অধ্যাপক আইজনার ‘মিডিয়েভাল মার্ডার ম্যাপস’ নামক একটি ডিজিটাল প্রকল্পের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকল্প প্রধান। এটি একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ রিসোর্স, যেখানে ১৪শ শতকের লন্ডন, অক্সফোর্ড এবং ইয়র্কে সংঘটিত খুন ও হঠাৎ বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে কেমব্রিজ কর্তৃক চালু করা এই প্রকল্পে লাতিন ভাষায় লিখিত মধ্যযুগীয় করনারের নথি অনুবাদ করে সেই সময়ের অপরাধের বিবরণ, কারণ ও অভিযুক্তের নাম দেওয়া হয়েছে — যা স্থানীয় জুরির শুনানি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তৈরি।

ফোর্ড হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে, করনারের নথিতে বলা হয় যে ফিটস্পেইন ও ফোর্ডের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল, এবং তিনি চারজন পুরুষকে — তার ভাই, দুইজন চাকর এবং এক যাজককে — তাকে হত্যার জন্য প্ররোচিত করেন। সেই সন্ধ্যায়, যাজক ফোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন এবং বাকিরা হামলা চালায়। তার ভাই তার গলা কেটে দেয় এবং চাকররা পেটে ছুরি মারে। চারজনের মধ্যে শুধু একজন চাকর, হিউ কোলন, ১৩৪২ সালে নিউগেট কারাগারে কারাবরণ করেন।
“আমি প্রথম যখন করনারের নথি পড়ি, তখনই মুগ্ধ হই,” বলেন অধ্যাপক আইজনার CNN-কে দেওয়া এক ইমেইলে। “এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে শত শত বছর আগের সময়কে যেন চোখের সামনে দেখতে পাই।” এরপর তিনি আরো খোঁজ নিতে আগ্রহী হন।
“একটা ব্যাপার জানতে ইচ্ছে করে — তদন্তকারী জুরি তখন কী আলোচনা করেছিল? কীভাবে এলা চারজন পুরুষকে একজন যাজককে হত্যা করতে রাজি করান? তাদের পুরনো ঝামেলাটা কেমন ছিল?” — এই সবই অধ্যাপক আইজনারের কৌতূহল জন্ম দেয়।
‘প্রতিশোধের পিপাসা’
আইজনার ২০১৩ সালের একটি গবেষণা থেকে খুঁজে পান আর্চবিশপের সেই বিখ্যাত চিঠি, যা লিখেছিলেন এক মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ হেলেন ম্যাথিউস। সেই চিঠিতে কঠোর শাস্তির আদেশ দেওয়া হয় ফিটস্পেইনকে — যেমন গরিবদের মধ্যে প্রচুর অর্থ দান, সোনা বা রত্ন পরিধানে নিষেধাজ্ঞা, এবং স্যালিসবারি ক্যাথেড্রালের পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে খালি পায়ে চার পাউন্ড ওজনের মোমের মোমবাতি হাতে নিয়ে হাঁটা। এই তথাকথিত লজ্জার হাঁটা তাকে প্রতি বছর শরৎকালে সাত বছর ধরে করতে আদেশ দেওয়া হয়।
তবে মনে হয়, ফিটস্পেইন এই আদেশ পালন করেননি। এবং এই অবমাননাই হয়তো তার “প্রতিশোধের তৃষ্ণাকে” উসকে দেয়, লিখেছেন গবেষণার লেখকরা।
আইজনার খুঁজে পাওয়া দ্বিতীয় সূত্রটি ওই চিঠির ১০ বছর আগের — ১৩২২ সালের এক তদন্ত রিপোর্ট, যেখানে ফোর্ড ও ফিটস্পেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত হয় একটি রাজার কমিশনের মাধ্যমে, ফ্রেঞ্চ বেনেডিক্টিন প্রিয়রির করা অভিযোগের ভিত্তিতে। সেই রিপোর্ট ১৮৯৭ সালে অনূদিত ও প্রকাশিত হলেও, তখনও ফোর্ড হত্যার সঙ্গে এর কোনো সংযোগ টানা হয়নি।
সেই অভিযোগ অনুযায়ী, ফিটস্পেইনের দল — যার মধ্যে ছিলেন ফোর্ড ও তার স্বামী স্যার রবার্ট, একজন নাইট — প্রিয়রির দরজা ও ভবন ভাঙচুর করে এবং প্রায় ২০০টি ভেড়া ও মেষশাবক, ৩০টি শুকর আর ১৮টি বলদ চুরি করে এনে ফিটস্পেইনের দুর্গে নিয়ে যায় এবং মুক্তিপণ দাবি করে। এই ঘটনায় একই সঙ্গে ফিটস্পেইন, তার স্বামী ও ফোর্ডের নাম দেখে আইজনার বিস্মিত হন।
“এটা ছিল খুবই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত,” বলেন তিনি। “একজন সম্ভ্রান্ত নারী, তার স্বামী ও এক যাজক — তারা একসঙ্গে গবাদিপশু চুরির মতো ঘটনায় জড়িত! এটা ভাবাই কঠিন ছিল।”

‘হিংস্রতার বিশেষজ্ঞ’
সেই সময়কার ব্রিটিশ ইতিহাসে, শহরের মানুষ সহিংসতা-প্রবণ ছিল। শুধু অক্সফোর্ডেই প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৬০-৭৫টি খুন হতো, যা আজকের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি। এক রেকর্ডে উল্লেখ আছে, “ছাত্ররা ধনুক, তলোয়ার, ঢাল, গুলতি আর পাথর নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে।” আরেকটি ঘটনার শুরু হয়েছিল এক মদের দোকানে, যা পরে রূপ নেয় রাস্তাজুড়ে বিশাল সংঘর্ষে, তলোয়ার-বাটার সঙ্গে ব্যাটল-অ্যাক্সও ব্যবহৃত হয়।
তবে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ড যতই হিংস্র হোক না কেন, “এর মানে এই নয় যে মানুষ সহিংসতা নিয়ে চিন্তিত ছিল না,” বলেন স্কোডা। “আইন, রাজনীতি ও সামাজিক পরিমণ্ডলে, সবাই সহিংসতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত থাকত।”
‘মিডিয়েভাল মার্ডার ম্যাপস’ প্রকল্প শুধু সহিংসতার পদ্ধতি নয়, বরং সহিংসতা নিয়ে জনগণের উদ্বেগ, বিচার ব্যবস্থা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটায় বলে মনে করেন স্কোডা।
এলা ফিটস্পেইনের জটিল পরকীয়া, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখায়, সামাজিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মধ্যযুগের লন্ডনে কিছু নারীর যথেষ্ট এজেন্সি বা কর্তৃত্ব ছিল — বিশেষ করে হত্যার ক্ষেত্রে।
“এলা একমাত্র নারী ছিলেন না, যিনি পুরুষদের ভাড়া করে কাউকে খুন করতেন নিজের সম্মান বাঁচাতে,” বলেন আইজনার। “এই ঘটনা মধ্যযুগীয় এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে উচ্চবিত্তরা ‘হিংস্রতার বিশেষজ্ঞ’ ছিলেন — যারা শক্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনে খুন করতেও দ্বিধা করতেন না।”