গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক বছর এখনো পূর্ণ হয়নি। কিন্তু যে ঐক্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি, পেশার মানুষ আন্দোলন করেছিলেন, সেই ঐক্য আর এখন দেখা যাচ্ছে না কেন?
কিভাবে ফিরতে পারে সেই ঐক্য?
শুধুমাত্র বিএনপির কারণে সেই ঐক্য ধরে রাখা যায়নি বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র যুগ্ম আহবায়ক মনিরা শারমিন।
তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “জুলাই ঘোষণাপত্রের ব্যাপারে ঐকমত্য কমিশন দারুণ আন্তরিক। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও যখন কোনো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তখন বিএনপি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের কারণেই জুলাই ঘোষণাপত্র করা যাচ্ছে না। তারা ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার কিছু বিষয় জিইয়ে রাখতে চায়। তাই আমরা বলেছি, সরকার যদি জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে না পারে, তাহলে আমরা সেটা দেবো।”
তবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ইমরান সালেহ প্রিন্স সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সেই ঐক্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। আমি মনে করি, এখনো আমাদের মধ্যে ঐক্য আছে। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পৃথক কর্মসূচি থাকবে, তারা সে অনুযায়ী কাজ করবে। একটি দেশে সবাই একটি বিষয়ে একমত হবে এমন তো না। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসবে। কিন্তু আলোচনায় একমত হতে না পারার অর্থ এই নয় যে, আমাদের মধ্যে ঐক্যমত নেই। আমরা মনে করছি, একটা নির্বাচনের মাধ্যমে সেই ঐক্য আবার পুনর্পতিষ্ঠা হতে পারে।
ঐক্য ধরে রাখতে না পারার কারণ জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “গত বছরের জুলাইয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ৮০ ভাগ ছিল শ্রমজীবী মানুষ আর ২০ ভাগ উচ্চ শ্রেণির মানুষ। যে ৮০ ভাগ শ্রমজীবী মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, তারা কিন্তু আন্দোলনের পর ঘরে ফিরে গেছেন। এখন সেই ঐক্য নিয়ে যারা দেনদরবার করছেন, তারা উচ্চ শ্রেণির। এখানে তাদের স্বার্থের সংঘাত আছে। ফলে তারা কখনো একত্রিত হতে পারবে না। কারণ, তাদের স্বার্থ ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। ফলে, যেটা ঘটার ছিল, সেটাই ঘটেছে বলে আমি মনে করি।”
আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বেসরকারি সংস্থা খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা খন্দকার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আজকে এই ঐক্যে ফাটল ধরার কারণ সরকার নিজেই। মানুষ যে আকাঙ্খা নিয়ে আন্দোলন করেছিল, সেই আকাঙ্খা থেকে সরকার অনেক দূরে। মানুষের মূল আকাঙ্খা ছিল গণতন্ত্র পূণঃপ্রতিষ্ঠা। সেটা কি হয়েছে? আমরা বলতে পারি এখনো হয়নি। তরুণ সমাজকে এই এক বছরে আমরা কী দিতে পেরেছি? সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর আকাঙ্খাকে ধারণ করে নির্বাচনের দিকে যাওয়া।”
বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি)-র সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “মূলত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে অভ্যুত্থান হয়েছিল, একটি গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, আরেকটি হলো বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। বৈষম্যহীন দেশ গড়ার কাজ তো শুরুই হয়নি। আর গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করতে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। সে পথেও এই সরকার এগোতে পারেনি। জুলাই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের ব্যবস্থা করা, শহীদদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া- এই কাজগুলো হচ্ছে, কিন্তু যে গতিতে হওয়া দরকার সেটা হচ্ছে না। সরকার আসলে যেসব কাজ করার দরকার নেই তারা সেই কাজে ব্যস্ত। ফলে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম নেয়। সেই অবিশ্বাস থেকেই ঐক্যে ফাটল ধরে। সরকার চাইলে এখনো সেটা ফিরিয়ে আনতে পারে।”
গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকারের কর্মসূচি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৯ জুন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করতে আগামী ১ জুলাই থেকে বিশেষ কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে কর্মসূচি শুরু হবে। কিন্তু মূল ইভেন্ট শুরু হবে জুলাইয়ের ১৪ তারিখ থেকে। এটি চলবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত। সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য জুলাইয়ে যেরকম পুরো বাংলাদেশ এক হয়েছিল, আবার সে অনুভূতিটাকে ফিরিয়ে আনা।
ঘোষিত কর্মসূচি: ১ জুলাই মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও প্রার্থনা। জুলাই ক্যালেন্ডার দেওয়া হবে। জুলাই হত্যাযজ্ঞের খুনিদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচির শুরু হবে; যা চলবে ১ আগস্ট পর্যন্ত। জুলাই শহীদ স্মরণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবৃত্তি চালু হবে।
৫ জুলাই, বিভিন্ন সময়ে অবৈধ আওয়ামী সরকারের জুলুম নির্যাতন প্রচারে দেশব্যাপী পোস্টারিং কর্মসূচি চালু। ৭ জুলাই, Julyforever.org ওয়েবসাইট চালু। ১৪ জুলাই ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’, ১৪ জুলাইয়ের ভিডিও শেয়ার, একজন শহীদ পরিবারের সাক্ষ্য; যা চলবে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত। জুলাই নারী দিবস হিসেবে এই দিনটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিন প্রত্যেক জেলায় জুলাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ৬৪টি জেলায় ও দেশের প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের ভিডিও প্রদর্শন। টিএসসিতে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, প্রজেকশন ম্যাপিং ও জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো।
১৫ জুলাই, ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া’, ভিডিও শেয়ার, জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও জুলাইয়ের গান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলইডি ওয়াল ইনস্টলেশন, প্রজেকশন ম্যাপিং, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন। ১৬ জুলাই, ‘কথা ক’, ভিডিও শেয়ার, শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে তিনটি বিভাগীয় শহরে ‘ভিআর শো’ প্রদর্শন, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদ স্মরণ অনুষ্ঠান, জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো প্রদর্শন, চট্টগ্রামে জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো প্রদর্শন।
১৭ জুলাই, ‘শিকল-পরা ছল’, ভিডিও শেয়ার। প্রতীকী কফিন মিছিল, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই স্মরণ’ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের ১৭ জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী। ১৮ জুলাই, ‘আওয়াজ উডা’, ভিডিও শেয়ার, ১ মিনিটের প্রতীকী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, জুলাইয়ের গান, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও ড্রোন শো, ঢাকার বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘জুলাই স্মরণ’ অনুষ্ঠান, ট্র্যাশন শো ও ম্যারাথন। ১৯ জুলাই, ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা’, ভিডিও শেয়ার, শহীদদের স্মরণে সমাবেশ-১ নরসিংদী, সাভার, ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জুলাইয়ের তথ্যচিত্র প্রদর্শন। এইদিনটিকে গণহত্যা ও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর থেকে প্রতিদিনই ভিডিও প্রচারসহ বেশ কিছু কর্মসূচী রয়েছে। শেষে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) ‘শোনো মহাজন’ নামে ভিডিও শেয়ার, ৬৪ জেলার কেন্দ্রে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ, শহীদদের জন্য প্রার্থনা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে বিজয় মিছিল, এয়ার শো, গানের অনুষ্ঠান, ‘জুলাইয়ের ৩৬ দিন’সহ জুলাইয়ের অন্যান্য ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, ড্রোন শো এবং র্যাপের সঙ্গে বচসা।
বিএনপির মাসব্যাপী কর্মসূচি
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে বিএনপির বিশেষ আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গুলশানের বাসভবন ফিরোজা থেকে ওই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হন খালেদা জিয়া। এছাড়া তার ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও লন্ডন থেকে ওই সভায় ভার্চুয়ালি যোগ দেন। মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই আলোচনা সভা শুরু হয়।
‘জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি পালন কমিটির’ আহ্বায়ক রুহুল কবির রিজভী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের যে কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি, সেগুলোর মধ্যে প্রথম হলো এই আলোচনা সভা। এছাড়া অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে আছে, বিজয় মিছিল, মৌন মিছিল, ছাত্র সমাবেশ, আলোচনা সভা, সেমিনার, রক্তদান, গ্রাফিতি অঙ্কন, পথনাটক, ফুটবল টুর্নামেন্ট, শিশু অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠান, ডেঙ্গু ও করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ ২২টি ভিন্নধর্মী আয়োজন। মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মোমবাতি জ্বালিয়ে ‘আলোয় আলোয় স্মৃতি সমুজ্জ্বল’ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থান ঘিরে বিএনপির কর্মসূচি শুরু করেছে।
জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবিতে অনড় এনসিপি
জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ আদায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অনড় থাকবে বলে জানিয়েছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে টালবাহানা সহ্য করা হবে না। মঙ্গলবার গণঅভ্যুত্থানপূর্তি উপলক্ষে রংপুরের পীরগঞ্জে বাবনপুর জাফরপাড়া গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতের পর এ কথা বলেন তিনি। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক দফার ঘোষক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘‘একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের অবশ্যই বিচার, সংস্কার এবং গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধানের দিকে যেতে হবে এবং জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে যে টালবাহানা শুরু হয়েছে, তা সহ্য করা হবে না।”
নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, ‘‘এনসিপির ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি মানে দেশ গঠনের জন্য যে উদ্যোগ দরকার তার জন্য এ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলবো। আবু সাঈদের স্বপ্ন, জুলাইয়ের স্বপ্ন- আমরা মানুষের কাছে তুলে ধরবো। আবু সাঈদ লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, আবু সাঈদের মতো অন্য সব শহীদেরা ফ্যাসিবাদী বিলোপের বিরুদ্ধে আমাদের যে লড়াই, তার অনুপ্রেরণা। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ আবু সাঈদ, ওয়াসীম, মুগ্ধসহ সব শহীদদের এবং আহত যোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে