বিশ্লেষণ, আমিয়েল আলকালাই : ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের যুক্তি একসময় ছিল পশ্চিমা অপরাধবোধ আর ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞের পর একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই যুক্তি এখন আর নেই। তার জায়গা নিয়েছে সহিংস বাইবেলীয় বাগাড়ম্বর — আমালেক, তৃতীয় মন্দির, আর ‘মনোনীত জাতি’র প্রতি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতির ভাষ্য।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এবং ‘কাফির’ ও ‘দেউস ভুল্ট’ উলকি-আঁকা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ — সবার বক্তৃতায় এখন একই সুর।
আল-কুদস দিবসে সম্প্রচারিত একটি স্প্লিট-স্ক্রিন দৃশ্য এই যুদ্ধের বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। বাঁ দিকে হেগসেথ ইরানি নেতৃত্ব সম্পর্কে উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, ‘ভয়ে ভূগর্ভে লুকিয়ে আছে — এটাই ইঁদুরের কাজ।’ আর ডান দিকে দেখা গেল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সম্পাদক আলি লারিজানি — যিনি পরে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন — তেহরানে জনতার সঙ্গে মিশছেন, সেলফি তুলছেন; পেছনে বিস্ফোরণের ধোঁয়া উঠছে।
পেন্টাগনের হুইসেলব্লোয়ার ওয়েস জে ব্রায়ান্ট হেগসেথের ‘নো কোয়ার্টার, নো মার্সি’ ঘোষণাকে ‘রক্তলিপ্সা’ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং বলেছেন এই মনোভাব তাঁকে পদের অযোগ্য করে তোলে।
যুদ্ধের প্রথম বার্তাটি এসেছিল মিনাবের একটি মেয়েদের বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলায়, যেখানে সাত থেকে বারো বছর বয়সী কমপক্ষে ১৬৮ জন ছাত্রী নিহত হয়, সঙ্গে তাদের সাহায্যে ছুটে আসা অভিভাবক ও শিক্ষকরাও।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের তিন প্রজন্মকে একই হামলায় শেষ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরিতে নামছে। ‘বৈরুতকে খান ইউনিসের মতো করে দেব’ — এই ঘোষণা দিতে দিতে বাস্তুচ্যুত পরিবার, চিকিৎসক ও উদ্ধারকর্মীদের হত্যা চলছে।
গাজা ও পশ্চিম তীরের কথা এখন মিডিয়ায় প্রায় নেই। ইসরায়েলি কারাগারে আটক, নির্যাতিত প্রায় দশ হাজার ফিলিস্তিনির কথা বলা হচ্ছে না বললেই চলে।
গত ১৫ মার্চ গাজায় কমপক্ষে ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নুসাইরাতের কামেল আইয়াশ, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হালিমা এবং পুত্র আহমাদ।
নাবলুস থেকে ঈদের কেনাকাটা সেরে ফেরার পথে ইসরায়েলি বাহিনীর অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারান আলি ও ওয়াদ বানি ওদেহ এবং তাঁদের পাঁচ ও সাত বছর বয়সী দুই সন্তান মোহাম্মদ ও ওসমান। সবাইকে মাথায় ও মুখে গুলি করা হয়। বেঁচে যাওয়া আট ও এগারো বছর বয়সী দুই শিশু মোস্তফা ও খালেদকে মারধর করে উপহাস করে যায় সেই সৈন্যরা, যারা মাত্র মুহূর্ত আগে তাদের এতিম বানিয়েছে।
একসময় পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম হামাসকে ‘পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে বড় হুমকি’ বলে তুলে ধরত। এখন সেই নাম প্রায় উচ্চারিত হয় না। তার জায়গায় এসেছে ইরানের ‘পারমাণবিক হুমকি’র কল্পকাহিনি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন একটি অচল প্রাচীরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নব্বই মিলিয়ন মানুষের ইরান একটি প্রকৃত রাষ্ট্র, যার কৌশলগত গভীরতা এবং বৃহদাংশে দেশীয় সমরাস্ত্র সত্যিকার অর্থেই শক্তিশালী।
স্বল্পসজ্জিত তালেবান আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করেছে। হামাস ও হিজবুল্লাহ হালকা অস্ত্র নিয়েও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে — বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে।
অর্থনীতিবিদ সামির আমিনের ভাষায় এই শক্তিকে বলা হয় ‘এম্পায়ার অব কেওস’ বা বিশৃঙ্খলার সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়বে কি না তা বলা কঠিন। তবে ইরানের দৃঢ়তা বিশ্বের অগণিত নিপীড়িত মানুষের কাছে একটি বার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যারা আছেন, তারাও দেখছেন দেশের অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, মূল প্রতিষ্ঠানগুলো ভেতর থেকে পচে যাচ্ছে। ‘ইসরায়েল ফার্স্ট, আমেরিকা লাস্ট’ — এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ আশা করছেন, এই সংঘাত মানুষকে চিরকালীন এই যুদ্ধচক্র ভাঙতে সক্রিয় করে তুলবে।
আমিয়েল আলকালাই: মার্কিন লেখক, অনুবাদক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ। রচনাটি মতামত বিভাগ থেকে সংকলিত।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই