রয়টার্স
ইরান-যুদ্ধ অবসানে তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। এই প্রস্তাবে পরমাণু ইস্যু আলোচনার বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে—যা ওয়াশিংটনের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে সংঘাত নিরসনের আশা ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে। দুই মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। কেবল এরপরই পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসা যাবে।
ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, ইসলামাবাদে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই প্রস্তাব বহন করে গিয়েছিলেন। প্রথম ধাপে চাওয়া হয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা এবং পুনরায় আক্রমণ না করার গ্যারান্টি। তারপর পর্যায়ক্রমে সামুদ্রিক বাণিজ্যে অবরোধ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হবে। সবশেষে পরমাণু ইস্যুতে বসা হবে। ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারে মার্কিন স্বীকৃতি চাইছে।
সোমবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এই প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করে না এবং ওয়াশিংটনের ‘রেড লাইন’ স্পষ্ট।
মর্কিন অবস্থান হলো, পরমাণু ইস্যু আলোচনার শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
গত সপ্তাহে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাই জেরেড কুশনারের ইসলামাবাদ সফর বাতিল হওয়ার পর শান্তি প্রচেষ্টা আরও পিছিয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি সেই সময় দুইবার পাকিস্তান সফর করেন। এরপর ওমান হয়ে সোমবার তিনি রাশিয়া যান এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঐতিহ্যবাহী মিত্র মস্কো থেকে তিনি সমর্থনের আশ্বাস পান।
মস্কোতে আরাঘচি বলেন, ট্রাম্প নিজেই আলোচনার অনুরোধ করেছেন, কারণ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
দুই পক্ষের অবস্থান এখনও অনেক দূরে থাকায় জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বাজার বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেলের প্রকৃত প্রবাহই এখন বিনিয়োগকারীদের একমাত্র উদ্বেগ, এবং সেই প্রবাহ এখনও বাধাগ্রস্ত।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। গত এক দিনে সেখান দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে এবং এগুলোর কোনোটিই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল নিয়ে যায়নি। মার্কিন অবরোধে গত কয়েক দিনে অন্তত ছয়টি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে ‘সমুদ্রপথে সশস্ত্র ডাকাতি ও জলদস্যুতার বৈধতাদান’ বলে নিন্দা করেছে।
অনুমোদন সূচক কমে যাওয়ায় ট্রাম্প দেশের ভেতরেও চাপে পড়েছেন। এই যুদ্ধে তিনি আমেরিকার জনগণকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের পাশাপাশি এই যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তাঁর প্রশাসন একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ খুঁজছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইরান ও একাধিক বিশ্বশক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তিটি তেহরানের কর্মসূচি কঠোরভাবে সীমিত করেছিল। তবে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে সরে আসেন।