ঘরের মেয়ে ঘরেই হারল, শুভেন্দুর জয়ের ব্যবধান ১৫ হাজারেরও বেশি

ঘরের মেয়ে ঘরেই হারল, শুভেন্দুর জয়ের ব্যবধান ১৫ হাজারেরও বেশি

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নিজের আসনেই হারলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন তিনি। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার ভবানীপুরে সেই ব্যবধান আরও বড় হলো।

মমতা-শুভেন্দুর রাজনৈতিক দ্বৈরথের প্রথম পর্ব ছিল নন্দীগ্রাম, ভবানীপুর দ্বিতীয় পর্ব। অনেকটা জেদ করেই ভবানীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন শুভেন্দু। নিজের জেতা আসন নন্দীগ্রামে লড়াইয়ের পাশাপাশি ভবানীপুরকে তিনি ‘রাজনৈতিক সুযোগ’ হিসেবে দেখেছিলেন।

মমতা নিজেই ভবানীপুরকে ‘বড়বোন’ এবং নন্দীগ্রামকে ‘মেজোবোন’ বলে সম্বোধন করেন। পাঁচ বছর আগে ‘মেজোবোন’ নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছে হেরেছিলেন তিনি। এবার ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও একই পরিণতি হলো তাঁর।

সোমবার ২০ রাউন্ডের গণনায় প্রথম থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। প্রথম রাউন্ডে মমতা এগিয়ে, দ্বিতীয় রাউন্ডে শুভেন্দু—এভাবেই চলছিল প্রাথমিক পর্ব। পঞ্চদশ রাউন্ড পর্যন্ত টানা এগিয়ে ছিলেন মমতা। তবে সপ্তম রাউন্ড থেকে প্রতিটি রাউন্ডে ব্যবধান কমাতে থাকেন শুভেন্দু। ষোড়শ রাউন্ডে গিয়ে মমতাকে ছাপিয়ে যান তিনি এবং সেই ব্যবধান আর কমেনি।

সকালে শুভেন্দু নিজাম প্যালেসে দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে পরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে পৌঁছান। ভবানীপুরের জনবিন্যাস বিশ্লেষণ করে তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও পরে এগিয়ে যাবেন। অন্যদিকে মমতা সকাল থেকে বাড়িতেই ছিলেন। দুপুরে উভয়েই গণনাকেন্দ্রে পৌঁছান এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।

গণনার মাঝে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের কাছে সংক্ষিপ্ত উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। একটি পেট্রল পাম্পে অবস্থানরত তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের পুলিশ সরিয়ে দেয়। এরপর বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। তৃণমূলের চেয়ার ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে।

কয়েক রাউন্ড গণনা বাকি থাকতেই গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মমতা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। পুরোটা একতরফা। সিআরপিএফের সামনে ধাক্কা দিয়েছে। আমি প্রার্থী, তবু আমাকে ঢুকতে দেয়নি।” মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ অগ্রবালের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি বলে দাবি তৃণমূলনেত্রীর।

মমতা আরও বলেন, “এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।”

জয়ের সনদ হাতে নিয়ে শুভেন্দু বলেন, “যাঁরা হিন্দুত্বের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, এই জয় তাঁদের প্রতি উৎসর্গ করলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো খুব দরকার ছিল। এবার তাঁর রাজনৈতিক সন্ন্যাস হয়ে গেছে।”

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি মোট আটটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত—৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৭ ও ৮২। মমতা নিজেই এই কেন্দ্রকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে থাকেন। এখানে প্রায় ২৪ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছেন। বাকি ৭৬ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বাংলাভাষী এবং ৩৪ শতাংশ অবাঙালি—গুজরাতি, পঞ্জাবি, মারওয়ারি, বিহারি ও ওড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।

এই নির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পর ভবানীপুর থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। তা কোন দলের জন্য কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে আগে থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল। গণনার ফলাফল সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।

প্রার্থিতালিকা ঘোষণার পর থেকে দেড় মাস ধরে ভবানীপুর রাজ্যের রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। শুভেন্দুর মনোনয়নপর্বে সঙ্গী হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুভেন্দু ভবানীপুরবাসীর জন্য আলাদা ইশতেহারও প্রকাশ করেন এবং ১০টি সভা, তিনটি মিছিল ও একটি রোড শো করেন।

অন্যদিকে মমতা সারা রাজ্যে প্রচারে ব্যস্ত থাকায় ভবানীপুরে শেষবেলায় নেমেছিলেন। তিনি সাতটি জনসভা ও ছয়টি পদযাত্রা করেছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাও করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা ফল দেয়নি।

সূত্র: আনন্দবাজার