গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে, এমনকি যুদ্ধবিরতির সময়ও ইরানের ওপর কয়েক ডজন বিমান হামলা চালিয়েছে আবুধাবি। এর ফলে স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে আমিরাত আগে যতটা স্বীকার করেছিল, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক আগে এবং অনেক গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিক থেকেই ইরানে হামলা শুরু করেছিল আরব আমিরাত। এমনকি গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেও তাদের আক্রমণ থামেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সামরিক অভিযানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কার্যত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছিল আবুধাবি।
ওয়াশিংটন ও ইজরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করেই এসব হামলা চালানো হয়। ইসরায়েল এতে মূলত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে।
হরমুজ প্রণালির কেশম ও আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার ও আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সের মতো কৌশলগত এলাকাগুলো ছিল আমিরাতের মূল লক্ষ্যবস্তু।
আরব আমিরাতের বেশ কয়েকটি হামলায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত আসালুয়েহ কমপ্লেক্সে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে চালানো একটি হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াশিংটন তখন ইসরায়েলকে ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণ বন্ধ করার অনুরোধ জানাতে বাধ্য হয়।
অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যেই দাবি করেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসে আবুধাবি।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল ও ড্রোন ছোড়ে ইরান। মূলত আমেরিকা ও তাদের মিত্রদের এই অভিযানের খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল তেহরানের লক্ষ্য।
আর ইরানের এই পাল্টা আক্রমণের মূল ধাক্কাটাই সইতে হয়েছে আমিরাতকে। তাদের লক্ষ্য করে অন্তত ২ হাজার ৮০০টি মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছিল তেহরান।
আমিরাতের এই সম্পৃক্ততা উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ফাটল আরও বড় করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরব গোপনে আমেরিকার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিল, আমিরাতের এই আগ্রাসনের জেরে গোটা অঞ্চলের তেল ও জ্বালানি ক্ষেত্রে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে বিশ্ব তেল বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
যুক্তরাষ্ট্র যাতে আবুধাবিকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে কূটনৈতিক পথে হাঁটতে বলে, সেজন্য সৌদি কর্মকর্তারা সে সময় ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধও সামনে এনেছে। রিয়াদ ইরানের বিরুদ্ধে এই যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে অস্বীকার করায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর ক্ষুব্ধ হন আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ।
এমনিতেই লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়েমেন আর সুদানের মাটিতে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে দুই উপসাগরীয় পরাশক্তি। তার ওপরে এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের ফাটল আরও চওড়া হয়েছে। এরপর এপ্রিলে হুট করে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারীদের জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যায় আরব আমিরাত। সেইসঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে বাড়াতে শুরু করে নিরাপত্তা-সম্পর্ক।
বিমান হামলার পাশাপাশি হরমুজে ইরানের অবরোধ ভাঙতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের জন্য জাতিসংঘে তোলা একটি প্রস্তাবের খসড়ায় সরাসরি সমর্থন দিয়েছে আমিরাত।
এছাড়া ইরানের দুবাইয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো তেহরানের সাথে যুক্ত সব স্কুল আর ক্লাব। বাতিল করে দেওয়া হলো ইরানি নাগরিকদের ভিসা আর ট্রানজিট।
প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বারবার অভিযোগ করেছে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে হামলায় যোগ দিয়েছে আমিরাত।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার নেশা আছে আরব আমিরাতের। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে পেশিশক্তি দেখাতেও পিছপা করে না তারা। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে গত কয়েক বছরে সুদান ও লিবিয়ার মিলিশিয়াদের আধুনিক অস্ত্র দিয়েছে আবুধাবি, একাধিক অভিযান চালিয়েছে ইয়েমেনে।
কিন্তু ইরানের মতো বড় আর কাছাকাছি থাকা শত্রুকে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আমিরাতের এই আগ্রাসী অবস্থান বুমেরাং হতে পারে। ইরানের সাথে বৈরী সম্পর্ক যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বড় টার্গেটে পরিণত হবে তারা। মে মাসের শুরুতেই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ ভাঙতে যখন অভিযান চালাল মার্কিন নৌবাহিনী, পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফুজাইরায় আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল-বন্দরে আক্রমণ করেছে ইরান।
সম্প্রতি ইরাক থেকে ছোড়া একটি ড্রোন আমিরাতের পারমাণবিক চুল্লির খুব কাছে আঘাত করেছে। ইরাকে বেশ কয়েকটি ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।
ইরানের জোরালো পাল্টা আক্রমণের জেরে আমিরাতের অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। বিমান পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে, পর্যটন শিল্প থেকে আয় কমে গেছে, মন্দা দেখা দিয়েছে আবাসন বাজারেও। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ধস নামায় কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই ও বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটির ঘোষণা দিতে শুরু করেছে।
এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত দুবাই ও আবুধাবি শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি হাওয়া হয়ে গেছে। পাশাপাশি বাতিল করতে হয়েছে ১৮ হাজার ৪০০-রও বেশি ফ্লাইট।
পরিস্থিতি বৈরী দেখে সম্প্রতি কিছুটা সুর নরম করেছে আরব আমিরাত। বিশাল সব জ্বালানি স্থাপনাগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ায় এখন কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে তারা। মে মাসের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার ব্যাপারে যে কয়জন আঞ্চলিক নেতা চাপ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্টও।
তবে ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের মৈত্রী আরও দৃঢ় হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে আমিরাতের ভূমিকা দেখে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। দুই দেশের এই সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি এক কৌশলগত জোট হিসেবে দেখছেন তারা।
আরব আমিরাতকে বাঁচাতে যুদ্ধের সময় আয়রন ডোম ব্যাটারি ও সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছিল ইসরায়েল। উপসাগরীয় দেশটির এক সামরিক ঘাঁটিতে এখনো মোতায়েন রয়েছে অনেক ইসরায়েলি সৈন্য। এছাড়া গোপনে আমিরাত সফর করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান ও সেনাপ্রধানসহ ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা।