গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে চলছে বাগযুদ্ধ। তবে এর মধ্যেই বিরোধী জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একের পর এক শারীরিক হামলার শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় কোনো সংঘাতের খবর নেই। বরং বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে এনসিপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো কীভাবে শুরু হলো?
সিলেট ও হবিগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই মার্চ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি এবং এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বাধা ও হামলার অভিযোগের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের কাছে, এনসিপির কর্মসূচির ভেন্যুর নিকটে দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা হয় বলে জানা গেছে।
পরদিন বুধবার এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও অন্য নেতারা হবিগঞ্জ শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গিয়ে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। দীর্ঘ সময় মহাসড়কে আটকে থাকার পর দলটি বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে মামলা দায়ের করে।
তার পরের দিন গোলাপগঞ্জে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে কানাইঘাটে যাওয়ার পথে সারজিস আলমের গাড়িতে ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয় এবং ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেওয়া হয়, যাতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়।
মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে?
হবিগঞ্জের হামলার ঘটনায় এনসিপির দায়ের করা মামলায় জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদসহ ১১ জনকে নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ রাজিব আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করায় ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, আর সেই ক্ষোভ থেকেই হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে দলীয়ভাবে বিএনপি বা ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
এনসিপি কী বলছে?
এনসিপি এসব হামলা ও বাধাকে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি বলে অভিহিত করেছে।
দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, বিএনপির নেতাকর্মীরাই হামলার ভিডিও ধারণ করে ছড়াচ্ছেন, যা তাদের রাজনৈতিক মদদের ইঙ্গিত দেয় বলে তিনি মনে করেন। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেনের অভিযোগ, বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে এনসিপির ওপর হামলা চালাচ্ছেন, কারণ এনসিপি জনগণের পক্ষে কথা বলছে এবং সরকারের ভাঙা প্রতিশ্রুতিগুলো সামনে আনছে।
উল্লেখ্য, গত ৩ জুন যশোরের বেনাপোল সফর শেষে এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতেও একইভাবে হামলা হয়েছিল।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া কী?
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, তার দল কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রতিপক্ষ মনে করে না, তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাতে জড়াতে চাইলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিরোধী দলগুলোর অবাধে মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সহিংসতার সমালোচনা করে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ছাত্রদলের আচরণ তাকে পুরোনো ছাত্রলীগ-সুলভ রাজনীতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে এবং সেই ধরনের রাজনীতি আর দেখতে চান না তিনি। পুরোনো রাজনীতি নতুন রূপে ফিরে আসছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলীর মতে, এনসিপি এই মুহূর্তে বিশেষ নজর কাড়ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, জামায়াতের রয়েছে আদর্শিকভাবে দৃঢ় সমর্থকগোষ্ঠী, আর এনসিপি লক্ষ্য করছে সেইসব তরুণ ভোটারকে, যারা না হলে হয়তো বিএনপিকেই সমর্থন করতেন। তার বিশ্লেষণে, সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় এনসিপি গণমাধ্যমে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে জামায়াত আধুনিক মিডিয়া ব্যবহার ও জনমত গঠনে তুলনামূলক পিছিয়ে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, এই দৃশ্যমানতা মূলত গণমাধ্যমকেন্দ্রিক, বাস্তব মাঠপর্যায়ে ততটা নয়। তাই বিএনপি জামায়াতের চেয়ে এনসিপিকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই তাড়াহুড়ো হবে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য কখনোই সহিংসতাকে বৈধতা দিতে পারে না—রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দেওয়া উচিত।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ