গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমের মধ্যে ‘সুশাসন ও নিরাপত্তা’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির মতে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম একদিকে যেমন সম্ভাবনা ও আশার সঞ্চার হয়েছে, অন্যদিকে সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগের’ কারণ রয়েছে।
রবিবার (০৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলকারনাইন।
নতুন সরকারের প্রথম দিকে (মার্চ ও এপ্রিল মাসে) দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটার তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ অংশে বলা হয়, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
“মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে।”
‘মব সংস্কৃতি’ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।”
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ‘দলীয়করণের’ সমালোচনা করে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান হচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ এবং পদায়নের অভিযোগও রয়েছে, যা সরকারের নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থি।”
শিক্ষা খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনিক রদবদলের বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, “যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।”
এর পাশাপাশি উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন, বিদ্যালয়ে পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়নের মতো উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক’ বলেছে টিআইবি।
সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ইতিবাচক দিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও আইনশৃঙ্খলা সংকটের মতো ‘বিশাল’ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
“শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা সরকার প্রধানের সদিচ্ছার প্রতিফলন। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের ঝুঁকিগুলো দ্রুত কাটাতে হবে।”