গাজীপুর সিটিতে দরপত্রে অনিয়ম, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে কার্যাদেশ!

সর্বনিম্ন বৈধ দরদাতাকে উপেক্ষা করার পেছনে কোনো লিখিত বা প্রকাশ্য কারণ দেখানো হয়নি, যা সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গাজীপুর সিটিতে দরপত্রে অনিয়ম, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে কার্যাদেশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের জোন-৫-এর (কাউলতিয়া) আওতাধীন এলাকায় ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে বৈধ দরদাতাদের তালিকায় সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে তালিকার ষষ্ঠ স্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, দুই কোটি ৩৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পের টেন্ডার আইডি ১২৬৬৩৩৭। গত ২৪ মে উন্মুক্ত করা এই দরপত্রে আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ খাতে কমপক্ষে তিন বছরের অভিজ্ঞতা, এক কোটি ৭৩ লাখ টাকার বেশি বার্ষিক গড় টার্নওভার এবং ৩৮ লাখ ২৮ হাজার টাকার লিকুইড অ্যাসেট থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। এর সঙ্গে বিগত পাঁচ বছরে কমপক্ষে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা সমমূল্যের একটি ডাস্টবিন নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্নের অভিজ্ঞতাও থাকতে হতো।

ডিসকাউন্ট ও প্রভিশনাল সাম যুক্ত করে আটটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর ছিল— সর্বনিম্ন দরদাতা সানফাই কনস্ট্রাকশনস: দুই কোটি তিন লাখ ২২ হাজার ৮৮৭ টাকা; শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: দুই কোটি নয় লাখ ৯২ হাজার ২৭৯ টাকা; মেসার্স নাহার করপোরেশন: দুই কোটি ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৭০৫ টাকা; জীবন কনস্ট্রাকশন: দুই কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার ৮৭৪ টাকা; মেসার্স দেওয়ান ট্রেডার্স: দুই কোটি ১১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৭ টাকা; মেসার্স আবদুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজ: দুই কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার ৯২৭ টাকা; আলপাইন ট্রেড: দুই কোটি ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৩ টাকা এবং সর্বোচ্চ দরদাতা এম নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ: দুই কোটি ৫২ লাখ পাঁচ হাজার ৫৮৮ টাকা।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম দর দিয়ে কাজের মান নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরসীমা বা এসএলটি (স্ট্যান্ডার্ড লোয়ার থ্রেশহোল্ড) নির্ধারণ করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এসএলটি ছিল দুই কোটি চার লাখ ৮৫ হাজার ২২৪ টাকা।

পিপিআর আইন অনুযায়ী, এই সীমার নিচে দর দিলে কারিগরি যোগ্যতা যা-ই হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করতে হয়।

দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতা সানফাই কনস্ট্রাকশনসের প্রাথমিক ও কারিগরি কাগজপত্র সম্পূর্ণ বৈধ ছিল। তবে তাদের প্রস্তাবিত দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কম এবং এসএলটির চেয়ে প্রায় এক লাখ ৬২ হাজার টাকা কম হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত কম দরে কাজ দেওয়া হলে নির্মাণকাজের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে—এই যুক্তিতেই এসএলটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

সানফাই বাতিল হওয়ার পর বাকি সাত প্রতিষ্ঠানের দর যাচাই করা হয়। এর মধ্যে এম নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে সাত দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি দর প্রস্তাব করায় তারাও এসএলটি সীমার বাইরে চলে যায় এবং বৈধ তালিকা থেকে বাদ পড়ে।

বাকি ছয় প্রতিষ্ঠান—শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং, নাহার করপোরেশন, জীবন কনস্ট্রাকশন, দেওয়ান ট্রেডার্স, আবদুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজ এবং আলপাইন ট্রেড—সবাই এসএলটি সীমার মধ্যে থেকে সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে কম দর প্রস্তাব করায় বৈধ দরদাতার তালিকায় স্থান পায়।

বৈধ ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করে শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, যাদের দর ছিল দুই কোটি নয় লাখ ৯২ হাজার ২৭৯ টাকা—সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ কম, কিন্তু এসএলটির ঊর্ধ্বে। পিপিআরের নিয়ম অনুযায়ী, এসএলটি অতিক্রম না করা দরদাতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কাজের জন্য সুপারিশ করার কথা।

এই হিসাবে শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরই কাজ পাওয়ার কথা ছিল, এবং তা অনুমোদিত হলে সরকারের মূল বাজেট থেকে প্রায় ২৪ লাখ সাত হাজার টাকা সাশ্রয় হতো।

কিন্তু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে গত ৮ জুন কর্তৃপক্ষ কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই বৈধ তালিকায় সর্বনিম্ন দরদাতা শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিংকে এড়িয়ে গিয়ে তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা মেসার্স আবদুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে কার্যাদেশ অনুমোদন করে। 

আবদুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজের প্রস্তাবিত দর ছিল দুই কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার ৯২৭ টাকা, যা শাহরিশের দরের চেয়ে প্রায় দুই লাখ ২২ হাজার ৬৪৮ টাকা বেশি।

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, কারিগরি মূল্যায়নের নামে কৃত্রিম অযোগ্যতার অজুহাত তুলে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। 

তাঁদের দাবি, সর্বনিম্ন বৈধ দরদাতাকে উপেক্ষা করার পেছনে কোনো লিখিত বা প্রকাশ্য কারণ দেখানো হয়নি, যা সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারেরা পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থাকা মেসার্স আবদুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজের মালিকপক্ষ চট্টগ্রামের বাসিন্দা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে কর্মরত ছিলেন এবং সেই সূত্রে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেই সখ্যতার সুবাদে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দিতে কৌশলে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সুদীপ বসাক—এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ (কাউলতিয়া)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হানিফ এ প্রসঙ্গে বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবেন।

উল্লেখ্য, ই-জিপি হলো সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন পোর্টাল, যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। এর মাধ্যমে দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে শিডিউল কেনা, দরপত্র জমা দেওয়া এবং চূড়ান্তভাবে কাজ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। প্রথাগত দরপত্র ব্যবস্থায় ঠিকাদারদের প্রায়ই হয়রানির শিকার হতে হতো; ই-জিপি পদ্ধতি সেই জটিলতা দূর করে যেকোনো নিবন্ধিত দরদাতাকে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঘরে বসেই দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।