গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
কালীগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল স্মার্টবোর্ড, সুপেয় পানির ফিল্টার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অস্বচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সাইকেল, দুস্থ নারীদের দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রান্তিক পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ছাগল ও গৃহ নির্মাণ উপকরণ।
শুক্রবার (২৬ জুন) কালীগঞ্জ আর আর এন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আনন্দঘন পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সামগ্রী বিতরণ করেন গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ টি এম কামরুল ইসলাম।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের সুধীজন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, ‘সাসটেইনেবল ক্যাম্পাস ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ও সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে চারটি ভিন্ন ধরনের সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল স্মার্টবোর্ড। শ্রেণিকক্ষে ভিডিও, অ্যানিমেশন ও ইন্টারেক্টিভ কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদান এখন আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও পাঠে আগ্রহ বাড়বে, শিক্ষকেরাও পাঠ উপস্থাপনে পাবেন নতুন সুযোগ।
৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে সুপেয় পানির ফিল্টার। বিদ্যালয়গুলোতে বিশুদ্ধ পানির অভাব দীর্ঘদিন ধরে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আসছে। এই ফিল্টার সেই সংকট দূর করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করবে।
৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে খেলাধুলার সরঞ্জাম। পাঠ্যক্রমের বাইরে শারীরিক সক্রিয়তা ও দলগত মনোভাব গড়ে তুলতে এই সামগ্রী শিক্ষার্থীদের সুষম বিকাশে ভূমিকা রাখবে।
৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম — হারমোনিয়াম, তবলাসহ নানাবিধ সামগ্রী। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চায় এই সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এছাড়াও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা বরাদ্দ থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত অস্বচ্ছল ও মেধাবী ৮০ জন ছাত্র এবং ৭৭ জন ছাত্রীকে মোট ১৫৭টি সাইকেল দেওয়া হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষায় কাদামাটির পথ, গ্রীষ্মে রোদের তীব্রতা — এই কঠিন যাতায়াত বিশেষত মেয়েশিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাইকেল পেয়ে যাতায়াতে সময় ও কষ্ট দুটোই কমবে, বাড়বে উপস্থিতির হার এবং কমবে ঝরে পড়ার আশঙ্কা। এই বিতরণে ছাত্রের পাশাপাশি ছাত্রীরাও প্রায় সমান সংখ্যায় সাইকেল পেয়েছেন, যা মেয়েদের শিক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ইতিবাচক।

একই অনুষ্ঠানে ১৫০ জন দুস্থ নারীর মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। পোশাক তৈরি, মেরামত কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে এই নারীরা পারিবারিক আয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারে নারীর উপার্জন কেবল সংসারের টানাটানিই কমায় না — পরিবারে তাঁর মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থানও শক্তিশালী করে।

সম্মিলিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ নিম্ন আয়ের ১০টি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে ২০টি ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। ছাগল পালনের মাধ্যমে এই পরিবারগুলো একটি স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করতে পারবে। পাশাপাশি উন্নত জীবনযাপনের সুবিধার্থে গৃহ নির্মাণ উপকরণও বিতরণ করা হয়েছে, যা সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট থেকে মুক্তি দিতে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার এই কার্যক্রম শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা, নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন — এই চারটি লক্ষ্যকে একই সুতোয় গেঁথেছে।
তবে বিতরণ করা সামগ্রীর সঠিক ব্যবহার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে এই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় দায়িত্ববোধই এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করে তুলতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।