টাঁকশালের শত মিলিয়ন ডলার প্রকল্পে অনিয়ম, বহাল রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

টাঁকশালের শত মিলিয়ন ডলার প্রকল্পে অনিয়ম, বহাল রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি উঠলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেডে (টাঁকশাল) এখনো বহাল রয়েছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যাদের বিরুদ্ধে শত মিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে বলে জানিয়েছে দৈনিক দেশ রূপান্তর।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগে ১৯৭২ সালের পুরনো মেশিনকে ২০২৩ মডেলে রূপান্তর, “অভি অ্যান্ড স্পার্ক” প্রযুক্তি প্রকল্প এবং ডিজাইন ও অরিজিনেশন প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ও লুটপাটের কথা বলা হয়েছে। 

এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন ও সরকারের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা ছাপানোর অভিযোগও রয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে উদ্ধৃত করে জানা গেছে।

দেশ রূপান্তর জানিয়েছে, টাঁকশালের ১৯৭২ সালের পুরনো মুদ্রণযন্ত্র সংস্কার করে ২০২৩ সালের প্রযুক্তিতে রূপান্তরের নামে একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির আপত্তি সত্ত্বেও অনুমোদিত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন কোনো কার্যকারিতা যোগ না করেই কাগজে-কলমে আধুনিকায়ন দেখিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ দেখানো হয়েছে।

দেশ রূপান্তর আরও উল্লেখ করেছে, টাঁকশালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উৎপাদন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নতুন মেশিন স্থাপনের চেয়ে পুরনো মেশিন সংস্কারে বেশি আগ্রহী, কারণ এতে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বেশি। পুরনো মেশিন সংস্কারে ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হতে পারে, অথচ নতুন আধুনিক মেশিন বসাতে ব্যয় হতো প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টাঁকশালের দুই সাবেক সিনিয়র প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে সংস্কার প্রকল্প নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, ২০১৬ সালে নতুন চারটি ব্যাংক নোট মুদ্রণযন্ত্র বসানোর পর প্রায় ৪০ বছরের পুরনো মেশিন সংস্কারের কোনো যৌক্তিকতা নেই, কারণ ১৫-২০ বছরের বেশি পুরনো প্রযুক্তি এখন অচল এবং সংস্কারের পরও আধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নোট মুদ্রণ সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তর জানায়, প্রকৌশলীদের মতে এসব মেশিনের যন্ত্রাংশ বাজারে সহজলভ্য না হওয়ায় আলাদাভাবে অর্ডার দিয়ে তৈরি করাতে হয়, যাতে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং সরবরাহেও দীর্ঘ সময় লাগে। পুরনো মেশিনে সূক্ষ্ম ও নিরাপদ মুদ্রণ সম্ভব না হওয়ায় নোটে ত্রুটি থেকে যাওয়ার এবং জালনোট তৈরির ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

দেশ রূপান্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন মেশিনে ঘণ্টায় ১১ থেকে ১২ হাজার শিট ছাপানো সম্ভব হলেও টাঁকশালের পুরনো মেশিনে স্থাপনকালে ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার শিট ছাপা হতো, যা এখন কমে ২ থেকে আড়াই হাজার শিটে নেমেছে। সংস্কারের পরও উৎপাদন-ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পুরনো মেশিনগুলো এখনো সাবেক “ডাইরেক্ট প্রিন্টিং” প্রযুক্তিনির্ভর, যেখানে আধুনিক “ইনডাইরেক্ট প্রিন্টিং” প্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ শতাংশ কম কালি লাগে বলে বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানিয়েছে দেশ রূপান্তর। যেহেতু নোট মুদ্রণের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ কালির পেছনে যায়, তাই পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যয়ও অস্বাভাবিক বেশি থেকে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর জানিয়েছে, নোট মুদ্রণের সংবেদনশীল প্রযুক্তি “অভি অ্যান্ড স্পার্ক” চালুর নামে সরকারি কোষাগার থেকে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে, এবং এই প্রকল্পে আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ও টাঁকশালের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফায়েত আরেফিনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নতুন ব্যাংক নোটের ডিজাইন ও অরিজিনেশন প্রকল্পে নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ নকশা ব্যবহারের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জালনোটের ঝুঁকিও বেড়েছে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা ছাপানোর বিষয়টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টাঁকশাল থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়, এবং ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বিপুল অঙ্কের টাকা ছাপানো হয়। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশ রূপান্তর।

দেশ রূপান্তর উল্লেখ করেছে, অভিযোগকারীদের মতে সে সময় টাঁকশালের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, টাঁকশালের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফোরকান হোসেন এবং উৎপাদন বিভাগের তৎকালীন জিএম আশরাফুল আলম। 

বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট প্রতিস্থাপনে নিয়মিত নতুন নোট ছাপানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হারে ছাপালে তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশ রূপান্তরকে উদ্ধৃত করে জানা গেছে, অভ্যুত্থানের পরও টাঁকশাল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বহাল থাকায় প্রকৃত সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। তাঁরা অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অবিলম্বে অপসারণ, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাঁকশালের কার্যক্রমের ফরেনসিক অডিটের দাবি জানিয়েছেন।

দেশ রূপান্তর জানিয়েছে, অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী দুদক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ তদন্ত চালালে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ অপচয়, অতিরিক্ত ব্যয়, মুদ্রণ কার্যক্রমের অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।

সূত্র:  দেশ রূপান্তর