রয়টার্স
ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারতে নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। দেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে এবং তার দল নিষিদ্ধ ঘোষিত অবস্থায় আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দীর্ঘতম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নেতা জানান, তিনি ও তার আওয়ামী লীগের সহকর্মীরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে হাজির হতে চান।
বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার বা এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যেখানে তার বাবা-মায়ের কবর রয়েছে।
এই প্রথমবারের মতো হাসিনা তার দেশে ফেরার একটি সময়সীমা নির্দিষ্ট করলেন এবং জানালেন যে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন।
তিনি জানান, নির্বাসিত আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও একইভাবে আত্মসমর্পণ করবেন। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত। তবে রয়টার্স দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মুখে দুই দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। দেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী দমন-অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যা তিনি নির্বাসনে থেকে অস্বীকার করে আসছেন। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দমন-অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
হাসিনার এই ফেরার সিদ্ধান্ত তৈরি পোশাক রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে, যেখানে সরকার দুই বছরের অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, এটি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চাপে থাকা সম্পর্ক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, আর ঢাকা বারবার তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য দিল্লির কাছে আহ্বান জানিয়ে আসছে।
হাসিনা জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি। ঢাকার কর্তৃপক্ষ বারবার তাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি নিজ ইচ্ছাতেই ফিরবেন।
বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা হাসিনার এই মন্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি; তবে গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছিল, তারা বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী।
বাবা—স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা—ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনায় আসা হাসিনা প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শুরুর দিকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন এবং ১৭ কোটি মানুষের এই মুসলিম-প্রধান দেশের অর্থনীতি ঘুরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও তার। তবে দীর্ঘ শাসনামলে তার সরকার ভিন্নমত দমন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
হাসিনা জানান, তাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। দিল্লিতে নিজের নির্বাসিত বাসভবন থেকে তিনি বলেন, তাই তিনি সবাইকে দেশে ফিরে একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাননি। বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে আদালতের কার্যক্রম মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগের বহু কর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন ও সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যে উঠে এসেছে। হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ঢাকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি, কারণ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচার—এসব বিষয় গোপন আলোচনার বিষয় নয় বলে তিনি মনে করেন।
কারাবরণ নিয়ে তিনি চিন্তিত নন বলে জানান, কারণ অতীতেও একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন থেকে ফেরার পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে আবার কারাবন্দি করা হয়, পরে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন তিনি।
এবার তার পালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, জনতা তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ায় তিনি জীবনের হুমকি অনুভব করেছিলেন। দীর্ঘ শাসনামলে ভুল হতে পারে বলে স্বীকার করলেও, সরকারের ভালো-মন্দ বিচারের অধিকার জনগণের—এই যুক্তি দিয়ে তিনি চূড়ান্ত রায় জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন।
হাসিনা আরও জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টিতে অনলাইন বৈঠক করেছেন। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তিনি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না বলে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত রাখা হবে—এই সিদ্ধান্ত জনগণের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।