গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশজুড়ে টানা বৃষ্টি ও বন্যার মধ্যেই সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মতো কয়েকটি জেলায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ভেঙে, কোথাও নৌকা বা ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি উঠেছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর অধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা আগেই ১৬ জুলাই পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছিল। কিন্তু বাকি আটটি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই হয়েছে, যদিও এসব এলাকার অনেক কেন্দ্রেও জলাবদ্ধতা ছিল।
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। ভিডিওতে পরীক্ষার্থীদের নৌকা ও ভ্যানে করে, এমনকি কোমরপানি ভেঙে কেন্দ্রে ঢুকতে দেখা যায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রেও একই সমস্যা হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়ায় কয়েকটি কেন্দ্রের আশপাশে পানি জমে যাওয়ায় সেখানকার শত শত পরিবারও জলাবদ্ধতায় আটকা পড়ে।
শিক্ষা বোর্ডগুলো অবশ্য বলছে, এ পরিস্থিতির দায় মূলত স্থানীয় প্রশাসনের।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে জানান, পরীক্ষা স্থগিত হবে কি না তা কেন্দ্রীয়ভাবে ঠিক হয় না — জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার ভাষ্যে, কেন্দ্রে পানি ওঠা ছাড়াও শিক্ষার্থীরা আদৌ পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটাও বিবেচ্য বিষয়। তবে বারবার পরীক্ষা পেছানো শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায় বলে সহজে স্থগিতের পথে হাঁটে না বোর্ড।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে বর্ষা এড়াতে পরীক্ষাসূচি এগিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের — ২০২৭ সাল থেকে এসএসসি জানুয়ারিতে ও এইচএসসি জুনে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে বর্ষার ঝুঁকি কমে।
উত্তরার এক পরীক্ষার্থী সোহা খাতুন ফেসবুকে লেখেন, বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় বৃষ্টির মধ্যে পড়াশোনা করা যায়নি, তার ওপর পদার্থবিজ্ঞানের মতো পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতেই। পুরান ঢাকার পরীক্ষার্থী মোস্তফা কায়সার সানির দাবি, শুধু চট্টগ্রাম নয় — গোটা দেশেই একই অবস্থা, তাই সব বোর্ডের পরীক্ষা অন্তত এক সপ্তাহ পেছানো উচিত।
সরকারি বিজ্ঞান কলেজের এক অভিভাবক রেহানা খাতুন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তার ছেলে আইসিটি পরীক্ষা শেষে ভিজে জ্বরে পড়েছে, তবু তাকে আবার পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সব জেলার প্রশাসক ও বোর্ড চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করেই এলাকাভেদে পরীক্ষা নেওয়া বা স্থগিতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আর পিছিয়ে যাওয়া পরীক্ষাগুলো পরে নেওয়া হবে।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. কবির উদ্দিন আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, জেলার দুটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা হলেও প্রশাসনের সহায়তায় নৌকা-ভ্যানে করে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে এবং দেরিতে আসাদেরও পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়েছে। প্রতি বর্ষায় এই সমস্যা হওয়ায় কেন্দ্র বদলের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৫ মিলিমিটার ও তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে — যা এ মৌসুমে রাজধানীর একদিনের সর্বোচ্চ রেকর্ড। একই সময়ে চট্টগ্রামে হয়েছে ১৬০ মিলিমিটার। সহকারী আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদের ভাষ্যে, মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও এ সপ্তাহে কিছু অঞ্চলে ভারী বর্ষণের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। সহকর্মী এ কে এম নাজমুল হক এর কারণ হিসেবে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও পশ্চিমা লঘুচাপের কথা বলছেন।
এনসিপি নেতা সারজিস আলম ফেসবুকে শিক্ষার্থীদের দাবি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে লেখেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় মন্ত্রণালয় এড়াতে পারবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, কোমরপানি পেরিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয় এবং এতে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকে না। পূর্বাভাস আগে থেকে থাকা সত্ত্বেও সমন্বয়ের অভাবে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি বলে মত দেন তিনি, পাশাপাশি দুর্যোগকালীন শিক্ষা পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি নীতিরও আহ্বান জানান।
জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর প্রশাসন থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন না আসায় সেসব এলাকায়ও নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষা হয়। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসকদের একাধিকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি।
কুমিল্লা সদর উপজেলার ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্র স্থগিত বা বদলের সিদ্ধান্ত বোর্ডের এখতিয়ার, আর এখনো তেমন কোনো নির্দেশনা আসেনি। তার মতে, ভোররাতের বৃষ্টিতে হঠাৎ জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় আগাম লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে জানান, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস