গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং ঋণের সুদসহ সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে বেশি ভাঙানোয় গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে ব্যাংকের বাইরের উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ ৩৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৫৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এসব উৎস থেকে যা ঋণ নিয়েছে তার থেকে সরকার পরিশোধ করেছে বেশি। এতে বাজেট অর্থায়নে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর সরকারের নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে।
গেল অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।
রবিবার (০২ অগাস্ট) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৭৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।
গেল অর্থবছরের ঋণের প্রায় পুরো অর্থই এসেছে তফসিলি ব্যাংক থেকে। অর্থবছরে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নিট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা নিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরকারের নিট দায় ৪ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা কমেছে।
এর অর্থ, সরকারের বাড়তি ঋণ সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে নয়; বরং ব্যাংকগুলোর আমানত ও বিনিয়োগযোগ্য তহবিল থেকে এসেছে।
ব্যাংকের বাইরে সরকারি অর্থায়নের পতনে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের দুর্বল বিক্রিও ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনার পরিবর্তে বিক্রি করছে বেশি।
দুর্বল রাজস্ব আদায়ও সরকারকে ব্যাংকমুখী করেছে। জুলাই-মে সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও তা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ৮১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কম রাজস্ব প্রবৃদ্ধি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং মূল্যস্ফীতিজনিত বাড়তি ব্যয় সরকারি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সরকারি ঋণের এই উল্লম্ফন ঘটেছে এমন সময়ে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মে শেষে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক আমানত ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ব্রড মানি ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিতে মিশ্র চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে প্রবাসী আয় ৩০ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, চলতি হিসাব এবং সামগ্রিক পরিশোধ ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে, বড় শিল্প উৎপাদন জুলাই-এপ্রিল সময়ে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির হয়ে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে নেমে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক খাতের সূচকে উন্নতি হলেও উৎপাদন, রপ্তানি ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতি এখনো দুর্বল রয়েছে।