ট্রাম্পের ৫০% শুল্কের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা কানাডার

টানা তিন দিনের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের ৫০% শুল্কের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা কানাডার

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির পণ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের জবাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় শনিবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ ঘোষণা দেন। বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত এসেছে।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন ইস্পাত, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যে ‘ডলার-ফর-ডলার’ হারে শুল্ক বসাবে কানাডা। এতে দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার রাতে দুই দেশ কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। টানা তিন দিনের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কের আওতায় কানাডার ওয়াইন, আসবাব, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার ছিপ ও হকি সরঞ্জাম রয়েছে। এসব পণ্যের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। গত ১৮ মাস ধরে তিন দেশের বাণিজ্য চুক্তির আওতায় কানাডার অধিকাংশ রপ্তানি শুল্কমুক্ত ছিল।

কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়েছে কি না, জানতে চাইলে কার্নি বলেন, ‘আপনার ওপর হামলা হলে আপনি যুদ্ধে থাকেন। আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।’

কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া অল্প কয়েকজন বিশ্বনেতার একজন। তিনি নতুন বাণিজ্য ও সামরিক জোট গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে কানাডার প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আলোচনার ব্যর্থতাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদার হওয়ার একটি সুযোগ নষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, কানাডার সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিত হয়নি।

ফক্স নিউজকে গ্রিয়ার বলেন, ‘আমরা কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের জবাব দিচ্ছি। তারা সবসময় সবচেয়ে ভালো চুক্তি পেয়েছে। এখনো আরও ভালো চুক্তি পেতে পারত। কিন্তু তারা তা চায়নি।’

কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক বসাবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এর বিস্তারিত জানানো হবে বলে কার্নি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘তারা যে প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা তা গ্রহণ করতে পারি না। তারা যা চেয়েছে, আমরা তা দেব না।’

ট্রাম্প শুক্রবার কানাডার সঙ্গে চুক্তির আশা প্রকাশ করেছিলেন। তবে কার্নি বলেন, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নতুন দাবি আলোচনার অগ্রগতি থামিয়ে দেয়।

কার্নির ভাষ্য, এসব দাবি ছিল ‘অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও অন্যায্য’। এতে কানাডার জন্য সম্ভাব্য চুক্তির সুবিধা কমে যেত। নতুন বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে কানাডার সক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবও ছিল।

বড় যানবাহন নিয়ে বিরোধ

নতুন মার্কিন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য আগামী সপ্তাহে সহায়তা ঘোষণা করবে কানাডা। এসব সহায়তা কয়েক বছর চলতে পারে।

নতুন মার্কিন শুল্ক কানাডার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশকে প্রভাবিত করবে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সফটউড কাঠ ও ওয়াইনের মতো কিছু শিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। চাকরি হারানো ও ব্যবসা বন্ধের আশঙ্কাও রয়েছে।

কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যান্ডেস লেইং বলেন, ‘প্রভাব মোকাবিলায় আমরা সব অঞ্চল ও খাতের ব্যবসাগুলোকে প্রস্তুত করব। কঠিন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করব।’

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড কার্নির পাল্টা শুল্কের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের অন্যতম কঠোর সমালোচক।

ফোর্ড বলেন, ‘আমি খুশি যে তিনি ওই চুক্তিতে সই করেননি। এটি খারাপ চুক্তি ছিল। অন্টারিও, গাড়ি, ইস্পাত ও উৎপাদন খাতের জন্যও এটি ক্ষতিকর ছিল।’

আলোচনার অন্যতম বড় বিরোধের বিষয় ছিল বড় আকারের যানবাহন।

তিনটি সূত্র জানিয়েছে, কানাডা হালকা যানবাহনের জন্য প্রস্তাবিত সুবিধাজনক শুল্কের আওতা মাঝারি ও ভারী ট্রাকেও বাড়াতে চেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এতে আপত্তি জানায়।

কার্নি বলেন, মার্কিন প্রস্তাব কার্যকর হলে কানাডায় তৈরি ফোর্ডের এফ-৩৫০, এফ-৪৫০ ও এফ-৫৫০ ট্রাক এবং জেনারেল মোটরসের সিলভেরাডো সুবিধার বাইরে থাকত। এতে কানাডায় উৎপাদন কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়ত।

কার্নি আরও বলেন, কানাডার সংস্কৃতি, ভাষা ও সার্বভৌমত্বকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কিছু প্রস্তাবও যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল। তবে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

গত বছর ট্রাম্পের সঙ্গে কঠোর দর-কষাকষির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হন কার্নি। তিনি এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় দেওয়ার বিরোধী।

কানাডার প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোয়েলিয়েভর বলেন, ‘কানাডীয়দের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের চাকরি ও ব্যবসার বিরুদ্ধে এসব অন্যায্য আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।’