গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তুষারধসের জেরে হঠাৎ নেমে আসা প্রবল বন্যায় নেপালে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন, যাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও আছেন। চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় তুষারধসের কারণে সৃষ্ট এই বন্যাকে নেপালের সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার (২৬ অগাস্ট) সকালে ভোটেকোশি নদীর উপনদী লেন্দেতে তুষারধসের ফলে পানি আটকে যায়, পরে তা প্রবল বেগে নেমে আসে। বৃষ্টিপাত না থাকায় স্থানীয়রা কোনো পূর্বাভাস পাননি এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজেই ব্যস্ত ছিলেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন সীমান্তবর্তী রাসুওয়াগাড়ির কাছের তিমুর বাজার। স্থানীয় কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুংগানা জানান, প্রথমে তিনি ভূমিকম্প হচ্ছে ভেবেছিলেন, পরে দেখেন প্রায় শতমিটার উঁচু পানির দেয়াল ধোঁয়ার মতো কুয়াশা নিয়ে নেমে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাজার তলিয়ে যায়।
কাস্টমস চেকপোস্টে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক যানবাহন ভেসে যায়। বন্যা সিয়াফ্রুবেসি হয়ে নিচের দিকে নামার পথে মানুষ, পশু, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো—সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি নাগরিক ও ৪৪ জন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। বন্যায় ৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও ৯টি ব্যাংক শাখা ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক ভেসে গেছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিখোঁজদের সংখ্যা বিবেচনায় এই বন্যা ১৯৯৩ সালের সারলাহি-রাউতাহাট-মাকওয়ানপুরের বন্যার (তখন প্রাণ হারান ১,৪০০ জন) পর দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানান, সোলে থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অনেক বৃদ্ধ ও শিশু এখনো নিখোঁজ। স্থানীয় বাসিন্দা গোকর্ণ অধিকারী বলেন, দান্ডাথোক তুপচে গ্রামে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই এবং যেসব বাড়ি দূর থেকে অক্ষত মনে হচ্ছে, সেগুলোও কাদা-জঞ্জালে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে আছে।
উল্লেখ্য, গত বছরও (৮ জুলাই) একই লেন্দে নদীতে বন্যায় অন্তত ১১ জন মারা যান এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী মিতেরি সেতু ভেসে গিয়েছিল।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সময়মতো তথ্য না পাওয়াই এত বড় প্রাণহানির মূল কারণ। রাসুওয়া জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া এই বন্যা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।

জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী প্রধান অনিল পোখরেল বলেন, চীনের দিক থেকে উৎপন্ন বন্যার ক্ষেত্রে অতীতেও একই সমস্যা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা না থাকলে এই সমস্যা চলতেই থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ জলবিজ্ঞানী বিনোদ পরাজুলি জানান, বুধবার সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে রাসুওয়া জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের কাছে বন্যার খবর পৌঁছায়, এবং মাত্র চার মিনিটের মধ্যে নিচু এলাকায় সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। তবে ততক্ষণে রাসুওয়ার বড় অংশ প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল।
ভোটেকোশি নদীর উজানে বসানো স্বয়ংক্রিয় বন্যা-পর্যবেক্ষণ স্টেশনগুলোও বন্যায় ভেসে যাওয়ায় কোনো সংকেত পাঠাতে পারেনি বলে জানান পরাজুলি। তবে নুওয়াকোটসহ নিচু এলাকায় পাঠানো সতর্কবার্তা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০১৯ সালে নেপাল ও চীনের মধ্যে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জরুরি সাড়াদান বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যাতে তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কথাও ছিল। কিন্তু বুধবারের দুর্যোগ প্রমাণ করেছে, কাগজে-কলমে থাকা চুক্তি আর তার কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার পর নেপাল ও চীনের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চীন সীমান্তের ওপারে পানি বাড়তে শুরু করলেই নেপালকে জানানোর বিষয়ে সম্মত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রিয়েল-টাইম সেন্সর ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বসানো জরুরি, তবে বিপদের উৎস যেহেতু সীমান্তের ওপারে, তাই একা নেপালের পক্ষে কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।
এদিকে উত্তরগয়া গ্রামীণ পৌরসভায় সতর্কবার্তা সঠিকভাবে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় শিক্ষক সোমলাল দংগোল। তিনি জানান, বেত্রাবতী ও সোলে বাজার সম্পূর্ণ ভেসে গেছে এবং শিক্ষার্থীদের আনতে যাওয়া একটি স্কুলবাসও নিখোঁজ রয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট