১৪ হাজার উদ্যোক্তাকে ২৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে সরকার

কম উৎপাদনশীল খাতে ব্যাংক অর্থায়ন কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই), রপ্তানিমুখী ব্যবসা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হবে।

১৪ হাজার উদ্যোক্তাকে ২৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে সরকার

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক 

সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়নের কৌশলগত কাঠামো পুনরুদ্ধারে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় রপ্তানিমুখী ব্যবসা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) এবং উদীয়মান খাতের প্রায় ১৪ হাজার উদ্যোক্তাকে পাঁচ থেকে সাত শতাংশ সুদে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে।

এই কাঠামোর আওতায় আগামী পাঁচ বছরে দেশের ঋণ বিতরণব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কম উৎপাদনশীল খাতে ব্যাংক অর্থায়ন কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই), রপ্তানিমুখী ব্যবসা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হবে।

এ পরিকল্পনায় অর্থায়নে বিস্তৃত সুযোগের পাশাপাশি ঋণ বিতরণের ওপর কঠোর নজরদারি, ঋণ দেওয়ার মানদণ্ড আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং খেলাপি ঋণের (এনপিএল) আরও সঞ্চয় ঠেকানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্তত এক লাখ ২০ হাজার নারী উদ্যোক্তা এবং আট লাখ এমএসএমই উদ্যোক্তাকে মোট ১৬০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কটেজ ও কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ ২৫ লাখেরও বেশি এমএসএমই ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণের সংকটের মধ্যে ঋণ সম্প্রসারণ

ব্যাংক খাত যখন ভয়াবহ খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবিলা করছে, ঠিক এমন সময়ে ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই বছর ডিসেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এক বছরে মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে দুই লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। এতে সম্পদের মানের অবনতিতে ভূমিকা রাখা আগের ঋণ বিতরণ পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি না করে কীভাবে ঋণ সম্প্রসারণ করা যায়, সেই চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনিয়মিত ও দায়িত্বহীন ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল তদারকিকে পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের কৌশল শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে, ব্যাংকঋণের সঠিক বণ্টন ও গুণগত মান উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়ার পরিবর্তনকে তুলে ধরছে।

সরকার কম উৎপাদনশীল খাতে ঋণের অতিরিক্ত প্রবাহ কমিয়ে এমন একটি নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে ঋণ উৎপাদনশীল, রপ্তানিমুখী ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় কাজে ব্যবহার হবে।

ঋণ বিতরণ পদ্ধতিতে সংস্কার

প্রথম বছরে কর্তৃপক্ষ সুদের হার নির্ধারণ ও ঋণ বিতরণ পদ্ধতি পর্যালোচনা করার পরিকল্পনা করেছে, যাতে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের চাহিদা এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এতে ঋণে সুদের হার ও ঋণ প্রবাহের ওপর নজরদারিও জোরদার হবে।

কাঠামোটিতে উচ্চঝুঁকির ঋণের ওপর আরও কঠোর তদারকি এবং ঋণের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে খেলাপি ঋণ জমা হওয়া ঠেকাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঋণ বিতরণে প্রশাসনিক অদক্ষতা কমানো এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোও এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। সরকারের মতে, এসব পদক্ষেপ ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়ার ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে।

এক থেকে তিন বছর মেয়াদি ঋণ পুনরুদ্ধার পর্যায়ে সরকার সুদের হার ও ঋণদানের পদ্ধতি নিয়ে একটি নীতিগত কাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে আরও পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ ও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংক খাতে প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং আরও ধারাবাহিকভাবে ঋণদানের মানদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রচলিত ব্যাংকঋণের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা, করপোরেট বন্ড বাজারের নির্দেশিকা, ঋণের গ্যারান্টি স্কিম এবং উন্নয়ন অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও কৌশলটিতে রয়েছে।

তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণের পুনর্গঠন ও ত্বরান্বিতকরণের ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি সহজ শর্তের ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই অর্থায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই), নারী উদ্যোক্তা এবং উদীয়মান খাতে দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ উদ্যোগের জন্যও অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার রপ্তানির বহুমুখীকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়নের সঙ্গে অর্থায়ন কর্মসূচিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনাও করছে। এর ফলে অর্থায়নের সুযোগ ক্রমেই বৃহত্তর শিল্প ও রপ্তানি নীতির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র:  টাইমস অব বাংলাদেশ