গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশে জাপানি মালিকানাধীন একটি কারখানায় তৈরি গাড়ির সিটের কভার রপ্তানি হচ্ছে জাপানে। সেখানে এসব কভার দিয়ে সম্পূর্ণ আসন বা সিট তৈরি করে হোন্ডা ও সুজুকিসহ বিভিন্ন কোম্পানির গাড়িতে সংযোজন করা হয়।
আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) অবস্থিত টিএস টেক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি দেশে ৪৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং সেখানে ৩৭৫ জন কর্মী কাজ করছেন।
গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। মূলত জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আসনের ট্রিম কভার সরবরাহ করে তারা।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া ছয়তলা স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি বিল্ডিংয়ে (এসএফবি) প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে।
কারখানাটিতে শ্রমিকেরা চামড়া ও অন্যান্য উপকরণ নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী কেটে বিভিন্ন অংশ সেলাই করে সিটের ট্রিম কভার তৈরি করেন। কাঁচামালের বেশির ভাগই আসে জাপান ও চীন থেকে।
তৈরি কভারগুলো পরে জাপানে টিএস টেকের বিভিন্ন কারখানায় পাঠানো হয়। সেখানে এগুলো দিয়ে সম্পূর্ণ আসন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ করা হয়।
টিএস টেক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাতোরু ওনিশি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “জাপানে আমাদের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি ও কাওয়াসাকি। বাংলাদেশে আমরা মূলত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের আসনের ট্রিম কভার এবং দরজা ও ছাদের ট্রিমের মতো প্লাস্টিকের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করি।”
তিনি বলেন, “কাঁচামাল কাটা ও সেলাইয়ের কাজ মূলত বাংলাদেশের কারখানায় করা হয়। এরপর জাপানে সম্পূর্ণ আসন তৈরি করা হয় এবং পরে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সেগুলো গাড়িতে সংযোজন করে।”
বাংলাদেশের কারখানাটিতে বর্তমানে বছরে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার সিটের ট্রিম কভার তৈরি হচ্ছে। আগামী বছরও উৎপাদন প্রায় একই পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
অটোমেশন ও থ্রিডি প্রিন্টিং
কারখানায় বিশাল উৎপাদন এলাকায় পুরোদমে কাজ চলছে। কোনো অংশে চামড়া কাটা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিকেরা সেলাই মেশিনে বিভিন্ন অংশ জোড়া দিচ্ছেন। কেউ কেউ যত্নসহকারে কভারের বিভিন্ন অংশ যুক্ত করছেন। অন্যদিকে তৈরি পণ্য পরীক্ষা ও মাপজোখ করছেন একদল শ্রমিক।
ওনিশি বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও অটোমেশনের ওপর ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে টিএস টেক। পাশাপাশি কারখানার নিজস্ব উৎপাদনকাজে থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০২৩ সালের আগস্টে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ছিল কনভেয়ার বেল্ট, অটোমেশন ব্যবস্থা ও অটো-লে মেশিন স্থাপন।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের জিগ ও উৎপাদন সহায়ক সরঞ্জামও কারখানাটিতেই তৈরি করে টিএস টেক। এর মধ্যে কিছু সরঞ্জাম থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে নকশা ও তৈরি করা হয়।
টিএস টেক একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের অধীনে তাদের ৭৩টি কারখানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে মোট প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে জাপানেই রয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার কর্মী।
ওনিশি বলেন, “জাপানের বাজারে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্য তৈরি করি। জাপানের বাইরেও টিএস টেক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করছে।”
ডে-কেয়ার সেন্টার
উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি কর্মীদের সহায়তায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে টিএস টেক বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।
২০২৫ সালে কারখানার ভেতরেই একটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। ওনিশি জানান, বর্তমানে সেখানে পাঁচজন শিশুসেবিকার তত্ত্বাবধানে ১৯টি শিশু রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির জাপানি ভাষার দোভাষী আসমার সন্তানও এই ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। তিনি বলেন, “এটি আমার জন্য খুবই ভালো হয়েছে। সন্তানকে ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে নিশ্চিন্তে কাজে মনোযোগ দিতে পারি।”
গর্ভবতী কর্মীদের জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে সবুজ রিবন পরানো হয়, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়।
সবুজ রিবন পরা এক কর্মী বলেন, “এখানে গর্ভবতী কর্মীদের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়।”
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড