গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এতে অভিযোগের মুখে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এ উদ্যোগকে অনেকাংশে স্বাগত জানালেও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে সেগুলোর সত্যতা মিললে দল থেকে বহিষ্কার কিংবা গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা আইন লঙ্ঘন করে—এমন কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন অপকর্মে অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করতে দলের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশুকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা এবং মিরপুরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর আবারও কঠোর অবস্থান নেয় বিএনপির হাইকমান্ড।
এসব ঘটনায় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা ও পেছন থেকে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতাকে দলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
মিরপুরের ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে এবং এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ‘স্পষ্ট বার্তা’
সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় সবার কাছে একটি বার্তা গেছে—অন্যায় করলে কেউ রক্ষা পাবে না।
তিনি বলেন, “তিনি (মিষ্টি) দলের একজন নিবেদিত এমপি। তার স্বামী নিহত হয়েছেন, ভাই নিহত হয়েছেন, পরিবার নির্যাতিত হয়েছে। তার অপরাধ এখনো প্রমাণিত হয়নি। তারপরও দল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।”
ফয়সল আহমদ বলেন, “আমাদের দল আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিস্ট নয়। আমাদের নেতা সবসময় ন্যায়ের পক্ষে। দলের মধ্যে কেউ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে। এটা সব পর্যায়ের নেতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।”
তিনি আরও বলেন, “দলের সবাই ভালো হবে—বিষয়টা এমন নয়। দলের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন, যারা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। দলের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা হয়, তারা সবাই এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন।”
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “অপরাধের বিরুদ্ধে দলের কঠোর অবস্থানের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। যারা অপরাধ করে, তাদের পাশাপাশি যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের মধ্যেও তোলপাড় তৈরি হয়েছে।”
কেন্দ্রীয় যুবদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে দলের বার্তা পরিষ্কার। দল ও দলের নীতি-আদর্শের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ালে দলের রাজনীতি করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সবার মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে। বিশেষ করে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তারা আতঙ্কে আছে। বিগত দিনে অনেক নেতাকর্মী নিগৃহীত হয়েছে। তারা হয়তো মনে করছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কিন্তু বিএনপি চেয়ারম্যানের কঠোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে দিয়েছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
নীরবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন কথাও বলছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, দলের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে অপকর্ম থেকে বিরত থাকলেও যারা দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউ কেউ নীরবে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দলের কঠোর অবস্থান তৃণমূলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে—এমনটা মনে করছেন না তারা।
মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদল নেতা মাজহারুল ইসলাম রাসেল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “যারা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তারা তো অবশ্যই শঙ্কিত। কারণ কখন থাবা দিয়ে জেলে ভরে দেয়, তার ঠিক নেই। তবে যারা আসলেই চাঁদাবাজ, তারা যে চাঁদাবাজি থেকে বিরত আছে, ব্যাপারটা এমন নয়। নীরবে চাঁদাবাজি করেই যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “কিন্তু দলের কঠোর অবস্থানের কারণে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং তারা খুশি। যারা দীর্ঘ সময় দলের রাজনীতি করেছে, দলের সংকটের সময় পাশে থেকেছে, তারা হতাশ হয়ে পড়েছিল। দলের কয়েকটি সিদ্ধান্তে তৃণমূলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসছে। তারা ভাবছে, হয়তো সামনে ভালো কিছু হবে।”
অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করছে বিএনপি
দলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন নেতাকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করতে কেন্দ্রীয় ও সাংগঠনিক ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগের তদন্তে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। তদন্তে অপরাধে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করবে পুলিশ।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বহিষ্কৃত নেতাকর্মীর সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি। এ ছাড়া অনেককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়াসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।