গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হামাস-হামলার রক্তক্ষয়ী ৭ অক্টোবরের আগে ইসরায়েল পেল আরও একটি ‘দুঃসংবাদ’। তাও আবার জায়নবাদের ‘জন্মভূমি’ যুক্তরাজ্য থেকে।
জায়নবাদীদের অনেকের বিশ্বাস—১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোরের ইহুদিদের জন্য জাতীয় রাষ্ট্র ঘোষণার মধ্য দিয়েই মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তারা যুক্তরাজ্যকে ইসরায়েলের ‘আঁতুড়ঘর’ হিসেবে মান্যতা দেন।
বেলফোরের সেই ঘোষণাটি তার নামেই অর্থাৎ, ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছে।
এবার সেই যুক্তরাজ্যে বামপন্থি-পরিবেশবাদী হিসেবে পরিচিত গ্রিন পার্টি জায়নবাদকে ‘বর্ণবাদ’ আখ্যা দিয়ে দলীয় প্রস্তাব পাস করেছে।
এই জায়নবাদের ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত। মোটা দাগে, যে ব্যক্তি মনে করেন ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত তিনিই ‘জায়নবাদী’।
একজন অ-ইহুদিও জায়নবাদী হতে পারেন। আবার একজন ইহুদিও ‘জায়নবাদবিরোধী’ হতে পারেন।
অর্থাৎ, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে ‘জায়নবাদ’ বলে। তাই সব ইহুদি জায়নবাদী বা ইসরায়েলপন্থি নন। আবার সব জায়নবাদী বা ইসরায়েলপন্থি ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে ইহুদি নন।
লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর জুইশ পলিসি রিসার্চ-এর তথ্য বলছে, ব্রিটিশ ইহুদিদের তিন ভাগের দুই ভাগ নিজেদের ‘জায়নবাদী’ হিসেবে গণ্য করেন।
লন্ডনভিত্তিক অপর ইহুদি সংগঠন ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম-এর জরিপে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের ৬ শতাংশ ইহুদি নিজেদের ‘জায়নবাদী’ হিসেবে পরিচয় দেন না এবং ৮৯ শতাংশ ইহুদি মনে করেন জায়নবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা ইহুদিবিদ্বেষের নামান্তর।
প্রস্তাবনাটি পাস হওয়ায় এখন গ্রিন পার্টির সদস্য বা সমর্থকদের অনেকে মনে করছেন, ‘জায়নবাদ’ হচ্ছে ‘বর্ণবাদ’। এটি মানবতাবিরোধী।
শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে সেখানকার আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী খোদ যুক্তরাজ্যের এক প্রভাবশালী দল থেকে এসেছে ‘ইসরায়েলকে বিলুপ্ত করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ ডাকও।
আজ সোমবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জায়নবাদকে ‘বর্ণবাদ’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেওয়ায় যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টির প্রধান জ্যাক পোলানস্কিকে ইসরায়েলে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
যদিও ইহুদি ধর্মাবলম্বী পোলানস্কি গত ৪ অক্টোবর জায়নবাদ নিয়ে তার দলের অভ্যন্তরীণ ভোটে অংশ নেননি।
এছাড়া, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্রিন পার্টির এমন প্রস্তাবনাকে ‘সুস্পষ্ট ইহুদিবিদ্বেষ’ বলে মন্তব্য করেছে।
কয়েকটি ইহুদি সংগঠন এই প্রস্তাবনাকে ‘ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত’ বলে অভিযোগ করেছে।
সংবাদ প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, এমন প্রস্তাবনা নিয়ে গ্রিন পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কেননা, এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘জায়নবাদ’ হচ্ছে ‘জাতিগত ইহুদি রাষ্ট্রের’ প্রতি সমর্থন।
গ্রিন পার্টির এই প্রস্তাবনায় ‘পুরো ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে একটি গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইংল্যান্ডের ব্রাইটন শহরে গ্রিন পার্টির কনফারেন্সে দলের প্রস্তাবনাটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ২২ সদস্য এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ৮১৩ জন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গ্রিন পার্টির ৫ সদস্যের মধ্যে ৪ জন তাদের দলের এই প্রস্তাবনার বিরোধিতা করেছেন।
প্রস্তাবনা অনুসারে, জায়নবাদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে ধ্বংস করা হয়েছে।
ভোটের পর গ্রিন পার্টির সদস্য ও প্রস্তাবনার সমর্থক লুবনা স্পেইটান জানান, এই প্রস্তাবনার সমর্থকরা মনে করেন যে, এর মাধ্যমে ‘নিপীড়নের বর্ণবাদী ব্যবস্থা’র বিরোধিতা করা যাবে।
তার ভাষ্য, ‘সব ধরনের বর্ণবাদ ও বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। এগুলোকে ছাড় দেওয়া যাবে না।’
নিজ দলে এমন প্রস্তাবনা নিয়ে ভোটের সময় দলপ্রধান পোলানস্কি অন্য শহরে নিজের উপনির্বাচনের প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।
গত ২ অক্টোবর অর্থাৎ, ভোটের আগে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘জায়নবাদের মাধ্যমে যদি ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করা হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই বর্ণবাদ। আমি একটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলের প্রধান ও একজন ইহুদি হিসেবে তাই বলব।’
গত ৪ অক্টোবর গ্রিন পার্টির সম্মেলনে জায়নবাদ নিয়ে ভোটের দিন ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, জায়নবাদকে ‘বর্ণবাদ’ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে গ্রিন পার্টির ইহুদিরা দ্বিধা-বিভক্ত।
গ্রিন পার্টির মধ্যে ‘গ্রিন ফর প্যালেস্টাইন’ সদস্যরা এই প্রস্তাবনা উত্থাপন ও ভোটের ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
দলনেতা মনে করেন, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এত মানুষের মৃত্যু হওয়ায় জায়নবাদ নিয়ে এমন প্রস্তাবনা ওঠা স্বাভাবিক।
ভোটের আগের দিন গ্রিন পার্টির উপনেতা মতিন আলি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে জানান, হামাসের সঙ্গে সংঘাতে ইসরায়েল বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করায় জায়নবাদ নিয়ে এমন প্রস্তাবনা উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রস্তাবনায় জায়নবাদের সংজ্ঞা পরিষ্কার করা হয়েছে। জায়নবাদ বলতে বোঝায় এক-জাতিভিত্তিক আন্দোলন। এর মানে দাঁড়ায় জাতি-নির্মূল অভিযান। এর মানে হচ্ছে গণহত্যা।’
ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইহুদি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের নৃশংসতা ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করার নামান্তর। তবে ব্রিটিশ সরকার মনে করে, ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে কিনা তা আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গ্রিন পার্টির প্রধান পোলানস্কি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সরকারের জঘন্য অপরাধগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।
তারা মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি ইহুদিদের অধিকারের প্রতি সমর্থন দেওয়ার মধ্যে কোনো সংঘাত নেই।
একই দিনে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিন পার্টি ‘ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরে আসার অধিকার, ইসরায়েলকে বর্জন, সেখান থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়া, দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র সংক্রান্ত পুরোপুরি অবরোধ দেওয়ার পক্ষে’ কাজ করে যাবে।
আজ ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি মনে করে, গ্রিন পার্টির এমন প্রস্তাবনা ‘দুই রাষ্ট্র’ সমাধানের বিরোধী।
উল্লেখ্য, ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ বলতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইসরায়েলের পাশে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভাবনাকে বোঝান।
বিশ্লেষকদের অনেকের ভাষ্য, ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি সরকারগুলো অধিকৃত অঞ্চলে নিয়মিত আগ্রাসন, হত্যা ও দখলের মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ভাবনাকেও ‘অবাস্তব’ করে ফেলছে।
এমন বাস্তবতায়, ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান মিত্র খাস যুক্তরাজ্যের মাটিতেই উঠছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তির আওয়াজ।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে, জায়নবাদ হচ্ছে ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এর লক্ষ্য—ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সমর্থন করা। ইহুদিধর্ম মতে, জেরুজালেমের জায়ন পাহাড়ে ঈশ্বর থাকেন।
তথ্য অনুসারে, জায়নবাদকে প্রথম রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কৃতিত্ব পান অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক থিওদর হারজল।
আজ লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য মিডল ইস্ট মনিটর এক প্রতিবেদনে জানায়, গ্রিন পার্টির উপপ্রধান মতিন আলির কাছে ২০২৬ সালটি ‘চমৎকার একটি বছর।’
তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘গত মে মাসে আমাদের ৪০০ কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আমাদের কাউন্সিলরের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ জন। পার্লামেন্টে ৫ জন সদস্য আছেন। এবং আমাদের দলের সদস্য সংখ্যা ৪ গুণ বেড়েছে।’
‘আর এখন যা দেখলেন তা অসাধারণ,’ যোগ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওসমানীয় খেলাফতের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিন অঞ্চল দখলে নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তাদের তৎপরতায় স্থানীয় অধিবাসী ও প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এখন সেই ব্রিটেনেই ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের পুরো অংশে শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যেভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ও ব্যাপক হারে আলোচিত হচ্ছে, তা সবাইকে বাড়তি ভাবনার খোরাক দেয়।