গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তারা শুধু জবাব দিয়েই থামবে না। প্রতিবেশী দেশে সামরিক অভিযান চালানো এবং মার্কিন অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিতে হামলার পথও খোলা রাখছে তেহরান। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ যখন থমকে আছে, ঠিক তখনই এই ঘোষণা এল।
একই সময়ে সৌদি আরব থেকে কিছু কূটনৈতিক কর্মীকে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল।
বুধবার আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি ঘোষণা করেন, ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি এখন ‘আক্রমণাত্মক ও অসম’। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে নীতি ছিল কেউ হামলা করলে জবাব দেওয়া। এখন কেউ হামলা করলে জবাব দেওয়া হবে এবং পাল্টা আক্রমণও চালানো হবে।
মোহেবি দাবি করেন, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ বেড়েছে। তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা দেননি। তাঁর মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের মান উন্নত হয়েছে এবং পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও নিশানা ভেদের নির্ভুলতাও বেড়েছে। এ ছাড়া ইরানি বাহিনী ‘সব বোমার জনক’ নামে একটি অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। এটি ‘শত্রুর জন্য নতুন’ কিছু হবে বলে তাঁর দাবি।
ইরান প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। তাঁর ভাষায়, ‘একভাবে-না-একভাবে খুব শিগগির কিছু একটা ঘটবে।’ সাউথ ক্যারোলাইনায় এক প্রচারসভায় তিনি বলেন, যুদ্ধ ‘খুব শিগগির’ শেষ হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরে আসতে পারত, তবে তারা চায় ফলাফল যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়। যদিও এর আগে ট্রাম্প ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ সপ্তাহে বলেছেন, শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো ‘অত্যন্ত কঠিন’। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করতে হবে ইরানকে।
ইয়েমেনের হুতিদের হামলার পর বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে থাকা জরুরি নয়, এমন কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস আরও হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপসাগরের অন্য মিশনের কর্মীদের পরিবারও সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
তবে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, পুরো উপসাগর জুড়ে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বর্তমান নির্দেশ ‘শুধু সৌদি আরবে থাকা কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য’।
বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, অবৈধ তেল পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। উত্তর উপসাগরে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তারা জানায়।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এখন সেই পরিমাণ চলাচল করছে না। তবে বিকল্প পথ ও পাইপলাইন ব্যবহার করে গত মাসে এই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরেছিল।
কিন্তু প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলা এবং ইয়েমেনে হুতি ও সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের লড়াই, যার জের ধরে সৌদি আরবেও হামলা হচ্ছে, তেলের দাম আবার বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্নের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সম্প্রতি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। রুবিও বুধবার বলেন, ‘ইরানের পরমাণু অস্ত্র পাওয়ার কোনো পথ তৈরি করে, এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে না।’ অন্যদিকে তেহরানের অবস্থান হলো, পারমাণবিক অস্ত্র অপ্রসার চুক্তির (এনপিটি) আওতায় সমৃদ্ধকরণের অধিকার তাদের আছে।
ইরান একটি সাত দিনের পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিনিময়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়বে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই বুধবার বলেছেন, ‘সবার জেনে রাখা উচিত, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপের মূল্য দিতে হবে।’ ইরনা বার্তা সংস্থার বরাতে জানা গেছে, তিনি আরও বলেন, কূটনীতি এই বোঝাপড়া তৈরি করতে পারলে ইরান তা-ই চায়। তবে যুদ্ধ চললে জবাব চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে।
গত রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর যুক্তি, দেশটির পরমাণু কর্মসূচি ও ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নতুন করে গড়ে ওঠা ঠেকাতে এটি জরুরি। ইসরায়েলের দীর্ঘতম মেয়াদের এই প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবারের নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে আছেন।
কেন এই নীতি বদল: ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েই তেহরান কৌশল বদলেছে। শুধু জবাব দেওয়ার নীতি বারবার হামলা ঠেকাতে পারেনি। তাঁর মতে, ‘তেহরান এখন একটি নতুন সমীকরণ দাঁড় করাতে চায়: ভবিষ্যতে ইরানে যেকোনো হামলার মূল্য আক্রমণকারীদের অনেক বেশি দিতে হবে।’
প্রচলিত সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে না পারায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাবকে ব্যবহার করছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
মার্কিন নির্বাচনের হিসাব: মর্তাজাভির মতে, ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাও তেহরানের কৌশলের অংশ, যার মধ্যে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টাও থাকতে পারে। জরিপে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির আসন হারানোর পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন এবং মনে করছেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ইরান ওয়াশিংটনকে শিক্ষা দিতে চায় যে ইরানে হামলার মূল্য অনেক চড়া, এমনকি নির্বাচনেও তার খেসারত দিতে হতে পারে।’ তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসন ইরানে হামলার আগে দুবার ভাবে।
পারস্পরিক ক্ষতি: আরব সেন্টারের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামি খুরি মনে করেন, এই নীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো হামলার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপরও ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি কৌশলের একটি অংশ যে ক্ষয়ক্ষতি ও কষ্ট সমান ও পারস্পরিক হতে হবে।’ তাঁর মতে, পশ্চিমের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জ করতে চায় ইরান। তিনি বলেন, ‘ইরানিরা আসলে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।’
খুরি সতর্ক করেন, এই কৌশলের অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়বে। জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন, বিমার খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চালানে এর আঁচ লাগবে। তাঁর কথায়, ‘কষ্ট মধ্যপ্রাচ্য, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্য অংশের মানুষকেও ভোগাবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনীতির সুযোগ এখনো থাকলেও দুই পক্ষই নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মর্তাজাভি বলেন, ‘আরেক দফা যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।’ হরমুজে উত্তেজনা বাড়ায় সংঘাত আরও ছড়ানোর ঝুঁকিও বেড়েছে। তাঁর মতে, আগামী দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচন হামলার সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্তমান গতিপথ আলোচনার চেয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকেই ঝুঁকে আছে।
খুরিও মনে করেন, সংঘাত আসন্ন। তবে তাঁর সংশয়, ‘যুদ্ধ’ শব্দটি যথাযথ কি না। তিনি মনে করেন, মার্কিন হুমকি দর-কষাকষির কৌশলের অংশও হতে পারে। নতুন হামলায় ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পরিবহন, সেতু ও অত্যাবশ্যক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘সম্ভবত কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ হামলা হবে, যার উদ্দেশ্য ইরানে জীবনযাত্রা কঠিন করে তোলা।’
তবে ইরান আরেকটি বড় হামলা সামলাতে পারবে কি না, তা পরিষ্কার নয় বলে খুরি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক চাপের মুখে তেহরানের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম।