মো. আবু হাসান
মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে হঠাৎ মনে হয়, পায়ের গোড়ালির ওপরের মাংসপেশি পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। তীব্র ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। চিকিৎসাভাষায় পায়ের এই পেছনের পেশির নাম ক্যাফ মাসল। ঘটনাটা শুধু অস্বস্তিকর নয়, এরপর ঘুম ফিরে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ভয়ের কারণ কম। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, রাতের এই পেশির টান সাধারণত নিয়ন্ত্রণযোগ্য, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। জনস হপকিন্স মেডিসিনের চিকিৎসক মোহাম্মদ ইমাম ডেইলি মেইলকে বলেছেন, বেশির ভাগ সময় এটি পায়ের পেছনের পেশির সাধারণ টান। প্রতিবার এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে না।
কেন হয় এই টান
আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, শরীরে পানি বা ভিটামিন-ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি থাকলেই এমন হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শরীরে কী কম আছে, তার চেয়ে ঘুমের সময় পেশি কী অবস্থায় থাকে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শোয়ার সময় পায়ের আঙুল নিচের দিকে নামানো থাকলে পেছনের পেশি সবচেয়ে বেশি গুটিয়ে থাকে। ভারী কম্বলের নিচে পা আটকে থাকলেও একই ঘটনা ঘটে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে থাকলে পেশি হঠাৎ খিঁচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার দিনে হাঁটাচলার সময় পেশি বারবার প্রসারিত ও সংকুচিত হয়, ঘুমের সময় এই নড়াচড়া প্রায় থাকে না। তাই অনেকক্ষণ হাঁটা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা হঠাৎ পরিশ্রম বাড়িয়ে দিলেও রাতে এ রকম টান ধরতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
মাঝেমধ্যে টান ধরা সাধারণত ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কিছু লক্ষণকে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রায় প্রতি রাতে টান ধরলে, কিংবা ব্যথা এত তীব্র হলে যে নিয়মিত ঘুম ভেঙে যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। পা অবশ লাগা, ঝিনঝিন করা, দুর্বলতা বা ফোলার মতো অন্য উপসর্গ থাকলেও একই কথা প্রযোজ্য।
নতুন ওষুধ শুরুর পর টান বাড়লেও সতর্ক হওয়া দরকার, কারণ কিছু ওষুধের সঙ্গে পেশির টানের সম্পর্ক থাকতে পারে। এর মধ্যে আছে কিছু প্রদাহনাশক, স্ট্যাটিন (কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ), মূত্রবর্ধক, শিরায় দেওয়া আয়রন এবং হাঁপানির কিছু ইনহেলার। বিনা কারণে ওজন কমলে কিংবা জ্বর বা অতিরিক্ত ক্লান্তির সঙ্গে টান ধরলে অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করানো দরকার। রক্ত চলাচলে সমস্যা, কোমরের নিচের অংশে মেরুদণ্ডের স্নায়ু চাপা পড়া, কিংবা পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগের সঙ্গেও ঘনঘন টান ধরার সম্পর্ক থাকতে পারে।
ড. ইমামের মতে, সাধারণ টান একেক রাতে একেক পায়ে হতে পারে। কিন্তু বারবার একই পায়ে ব্যথা হলে, বিশেষ করে সেই পা ফুলে গেলে, গরম লাগলে বা লালচে হয়ে গেলে ডাক্তারকে জানানো উচিত।
টান ধরলে কী করবেন
টান ধরলে পায়ের আঙুল ও পাতা ধীরে ধীরে হাঁটুর দিকে টানুন। এতে পেছনের পেশি প্রসারিত হয়ে টান কমে। দরকার হলে সাবধানে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটুন। আক্রান্ত জায়গা আলতো করে মালিশ করতে পারলে ভালো। হালকা গরম পানিতে গোসল করা যায়, বা হিটিং প্যাডে হালকা তাপ দেওয়া যায়। তবে ত্বক যেন না পোড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
আবার যেন না হয়
প্রতিরোধের উপায়গুলো সহজ। ঘুমানোর আগে এক-দুই মিনিট পায়ের পেছনের পেশি ও হ্যামস্ট্রিং ধীরে ধীরে টেনে নিন। সন্ধ্যায় হালকা হাঁটলে পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ভালো থাকে। ঘুমের সময় পায়ের পাতা যেন দীর্ঘক্ষণ নিচের দিকে ঝুলে না থাকে, সে জন্য প্রয়োজনে বালিশ ব্যবহার করুন। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস রাখুন।
অ্যালকোহল ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলাও ভালো, কারণ এতে পেশির অস্বস্তি বাড়তে পারে। অ্যানালস অব ফ্যামিলি মেডিসিন সাময়িকীর একটি গবেষণায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে অ্যালকোহল ও রাতের পেশির টানের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ম্যাগনেসিয়ামের ভরসা কতটা
পায়ের টান ঠেকাতে ম্যাগনেসিয়ামের কথা অনেকেই শোনেন। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? কক্রেন ডেটাবেজ অব সিস্টেমেটিক রিভিউস-এর পর্যালোচনা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের রাতের পায়ের টান প্রতিরোধে ম্যাগনেসিয়ামের কার্যকারিতার প্রমাণ এখনো চূড়ান্ত নয়। ড. ইমামও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, ম্যাগনেসিয়াম জনপ্রিয় সম্পূরক হলেও এর পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সাধারণভাবে নিরাপদ হলেও বিনা প্রয়োজনে বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
শেষ কথা
রাতে পায়ে হঠাৎ টান ধরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। ঘুমানোর আগে পেশি প্রসারণ, পায়ের সঠিক অবস্থান আর পর্যাপ্ত পানি পানের মতো ছোট কিছু অভ্যাসেই সমস্যা কমতে পারে। তবে টান খুব ঘনঘন ঘটলে বা ব্যথা তীব্র হলে, একই পায়ে বারবার হলে, কিংবা পা ফোলা, লালচে হওয়া, দুর্বলতা বা ঝিনঝিন ভাব থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
একটি বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার। এক পা হঠাৎ ফোলা, ব্যথা ও গরম হয়ে উঠলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা থাকলে তখনই জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন। কারণ এগুলো রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
মো. আবু হাসান: বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)।
সূত্র: ডেইলি মেইল